আল্লাহর অস্তিত্বঃ কুরআনের আর্গুমেন্ট

নাস্তিক্যবাদের অসারতা



 

লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আল বান্না

 

 “তারা কি শূন্য থেকেই সৃষ্টি হয়ে গেছে,না তারা নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা? না তারা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছে?বরং তারা বিশ্বাস করে না”  [১]

 

কুরআনের এই আয়াতগুলো আমাদেরকে আল্লাহর অস্তিত্বের একটি শক্তিশালী এবং ইন্টুইটিভ (intuitive) আর্গুমেন্টের সামনে দাড় করায়। কুরআন এখানে “ خُلِقُو ” শব্দটি ব্যবহার করেছে।  সুতরাং এই আর্গুমেন্টটি যা কিছু অস্তিত্বে আসে অর্থাৎ যা কিছু সৃষ্ট সেই সকল বস্তুর উপরেই প্রয়োগ করা যায়। আর্গুমেন্টটিকে যদি ছোট ছোট অংশে ভাঙ্গা যায় তাহলে দেখা যাবে যে কুরআন এখানে কোন কিছু সৃষ্টি  হওয়ার কিছু সম্ভাব্য উপায় বলছে।

 

  • শূন্য থেকে সৃষ্টিঃ “তারা কি শূন্য থেকেই সৃষ্টি হয়ে গেছে?”
  • নিজে থেকেই নিজের অস্তিত্বে আসাঃ “তার নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা?”
  • সৃষ্ট কোন কিছু থেকে অস্তিত্বে আসাঃ “তারা কি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছে?” এখানে কুরআন বলছে কোন সৃষ্ট বস্তুর অন্য একটি সৃষ্ট বস্তু থেকে অস্তিত্বে আসার কথা”।
  • আল্লাহঃ “বরং তারা বিশ্বাস করে না”।

 

এখন আমরা কুরআনের আয়াতগুলো থেকে বেরিয়ে একটি ইউনিভার্সাল আর্গুমেন্ট দাড় করাবো।

 

    ★মহাবিশ্ব সসীম।

    ★সসীম মহাবিশ্বকে অবশ্যই অস্তিত্বে আসতে হবে। সম্ভাব্য চারটি উপায় হল ( কুরআন অনুযায়ী)  – শূন্য থেকে,নিজেই নিজে থেকে, অন্য কোন সত্তা থেকে যে কিনা নিজেই সৃষ্ট এবং এমন এক সত্তা থেকে যিনি কিনা নিজের অস্তিত্বের জন্য অন্য কোন সত্তার উপরে নির্ভরশীল নন অর্থাৎ একজন নেসেসারি বিয়িং।

    ★শূন্য থেকে,নিজেই নিজে থেকে এবং সৃষ্ট কোন কিছু থেকে ( contingent being) মহাবিশ্ব সৃষ্টি হতে পারে না।

    ★সুতরাং, মহাবিশ্বের অস্তিত্বে আসার কারণ হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাতায়ালা।

 

মহাবিশ্ব কি সসীম?

আজ থেকে প্রায় ২৪০০ বছর পিছনে প্রাচীন গ্রিস থেকে একটু ঘুরে আসুন। পথে হয়তো লাইসিয়াম থেকে আসা কিংবা এপিকিউরিয়ানদের  বাগান থেকে বের হওয়া কারো সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে। তাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন “এই মহাবিশ্ব কোথা থেকে অস্তিত্বে আসলো ?” তাহলে সে হয়তো আপনাকে বোকা মনে করে উত্তর দিতো – “আরে মিয়া একি বলেন? মহাবিশ্বের আবার শুরু আছে নাকি? এটা তো অসীম কাল থেকেই আছে। এর আবার অস্তিত্বে আসতে হবে কেন?” এই যেমন  এরিস্টটলই মনে করতেন মহাবিশ্বে, অন্য সব কিছু বিরাজমান পদার্থ থেকেই তৈরি হয়।এই ধরুন আপনি একটি বাড়ি বানাবেন।  এখন, বাড়ি বানাতে আপনার দরকার ইট,বালু,সিমেন্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। এই বস্তু গুলো কিন্তু মহাবিশ্বেরই অংশ। এদেরকে এরিস্টটল বলতেন “Substratum”। আর মনে করতেন এই সাব-স্ট্রাটাম হল ইটারনাল মানে অনন্ত কাল ধরেই আছে এর কোন শুরু নাই! সে যাইহোক, কষ্ট করে এত পেছনেও যেতে হবে না। এই ধরুন ফিলোসফার বার্টান্ড রাসেলকেই জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি যা বলতেন-

“The universe is just there, and that’s all.”  [২]

 

কিন্তু থার্মোডায়নামিক্স এর দ্বিতীয় সূত্রটি সব সময় মহাবিশ্বের একটি শুরুর দিকে ইঙ্গিত  দেয়। এই নীতি বলে যে, কোন একটি বদ্ধ ব্যবস্থা (Closed System) সব সময় একটি সাম্যাবস্থার দিকে আগায়। অর্থাৎ সময়ের সাথে সাথে এন্ট্রপি বেড়ে একটি তাপীয় মৃত্যুর দিয়ে আগায়। সুতরাং আমাদের মহাবিশ্ব যেহেতু সম্মিলিত ভাবে একটি বদ্ধ ব্যবস্থা,তাই অসীম কাল থেকে এর অস্তিত্ব থাকলে এটি এখন  তাপীয় মৃত্যুর অবস্থায় থাকতো। আপনি এই লেখা পড়ার জন্য এখানে থাকতেন না কিংবা আমি এই লেখা লেখার জন্যও হয়তো থাকতাম না। যাই হোক এখানে আমরা কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উপর নির্ভর করে আগাবো না। কারণ, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৭ টির মত কজমোলজিকাল থিওরি  রয়েছে যেখানে কিছু তত্ত্ব বলে মহাবিশ্ব চিরস্থায়ী  (eternal) আর কিছু বলে মহাবিশ্বের একটি নির্দিষ্ট শুরু আছে।

 

এক্ষেত্রে আমরা কিছু এনালজি দেখবো যে মহাবিশ্ব কি আসলেই অসীম হতে পারে কি না। প্রকৃত পক্ষে কি বিচ্ছিন্ন ভৌত জগতে (Discrete physical world)   অসীম (Actual infinity)  থাকতে পারে? অসীমতাকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমত, আনডিফারেন্সিয়েটেড অসীম।অর্থাৎ যা ছোট ছোট অংশে ভাগ করা যায় না। এমন কিছুর অসীমতা। যেমন স্রষ্টার অসীমতা।  অন্য ধরণের অসীমতা হচ্ছে, অসীমতাকে  ভৌত জগতের কিছুর উপর আরোপ করা। যে সকল বস্তুকে ছোট ছোট পার্টে ভাগ করা যায় তাদের উপরে আরোপ করা।  যেমন ধরুন মহাবিশ্বের কোন বস্তুর উপরেই। প্রথম ধরনের অসীমতা থাকা সম্ভব কিন্তু দ্বিতীয় ধরনের অসীমতা কি সম্ভব? অর্থাৎ প্রকৃত অসীম থাকা কি সম্ভব?

কয়েকটি উদাহরণ দেখা গেলেই বোঝা যাবে যে প্রকৃত অসীম থাকা খুবই অসম্ভব ।

 

    ★একটি ব্যাগ কল্পনা করুন যাতে অসীম সংখ্যক বল রাখা আছে। এখন যদি আপনি ব্যাগ থেকে দুইটি বল সরিয়ে ফেলেন তাহলে ব্যাগে কয়টি বল থাকবে? গাণিতিকভাবে  এখনো অসীম সংখ্যক বলই ব্যাগে আছে। কিন্তু যা ছিল তার থেকে দুটি কম।এবার যদি আপনি দুটি বল ব্যাগে যোগ করে দেন তাহলে কয়টি বল ব্যাগে থাকবে?যা ছিল তার থেকে দুটি বেশি।মানে অসীম থেকে দুই বেশি? অসম্ভব!  আপনি ব্যাগ থেকে বলগুলো বের  করে গুনে দেখতে পারেন কিন্তু আপনি কখনই অসীম সংখ্যক বল গুনতে পারবেন না। কারণ, অসীম কেবল একটি ধারণা মাত্র। বস্তু জগতে এর কোন অস্তিত্ব নেই।এ জন্যই বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট (David Hilbert) বলেছিলেন-

“The infinite is nowhere to be found in reality. It neither exists in nature nor provides a legitimate basis for rational thought..... the role that remains for the infinite to play is solely that of an idea”. [৩]

    ★কিছু কিউবের কথা চিন্তা করুন।প্রথম কিউবটি ১০ কিউব সেন্টিমিটার আয়তনের।এবার এর উপরে এর অর্ধেক আয়তনের একটি কিউব রাখুন। এভাবে আবার দ্বিতীয় কিউবের অর্ধেক আয়তনের আরেকটি কিউব এর উপর রাখুন। এভাবে রাখতে থাকুন। কিউব রাখতে রাখতে অসীম সংখ্যক কিউব রাখুন। এবার সবচেয়ে উপরের কিউবটি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন।  সেখানে কি কোন কিউব আছে? ধরুন আছে এবং আপনি সেটি সরিয়েও ফেললেন।  তাই যদি হয়, মানে সবচেয়ে উপরে যদি একটি কিউব থাকে তাহলে কি দাড়ালো? দাড়ালো কিউবের টাওয়ার কখনোই অসীমে পৌঁছায়নি। আর সবচেয়ে উপরে যদি কোন কিউব না পাওয়া যায় তাহলেও কিউবের টাওয়ারটি কখনই অসীমে পৌঁছাতে পারেনি। এর মানে  discrete physical things কখনোই অসীম হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডও ওপরে বলা ব্যাগের বলগুলো আর কিউবগুলো থেকে ভিন্ন কিছু নয়। এই মহাবিশ্ব যৌক্তিকভাবে সসীম আর এর অবশ্যই একটি শুরু থাকতেই হবে।

 

শূন্য থেকে সৃষ্টিঃ

শূন্য থেকে কি কিছু সৃষ্টি হতে পারে? এর উত্তর আমরা আমাদের ইনটুইসন (intuition)  থেকে কোন দ্বিধা ছাড়াই দিয়ে দিতে পারি- “না”। মেটাফিজিক্যাললি- Being can’t come  from nonbeing. তবে ,এখানে উল্লেখ করা দরকার, পরম শূন্যতা আর কোয়ান্টাম শূন্যতা একই বিষয় নয়। কোয়ান্টাম শূন্যতা কখনই পরম শূন্যতা নয়। কোয়ান্টাম শূন্যতায় ভ্যাকুয়াম এনার্জি থাকে। সুতরাং এটা নাথিং নয় সামথিং।  পরম শূন্যতায় কোন স্থান- কাল, শক্তি এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ - কোন কার্য-কারণ( Cause and effect) থাকবে না। এমন শূন্যতা থেকে কিছু অস্তিত্বে আসা সম্ভব নয়। এরকমটা হলে, যে কোন কিছু যে কেউ দাবি করে বসতে  পারে।যেমনঃ  বিশাল ভবন টুপ করে নাই হয়ে যেতে পারে, হঠাৎ যে কোন কিছু অস্তিত্বে চলে আসতে পারে। ব্যাপারটা কতটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভাবুন।সুতরাং পরম শূন্যতা, যেখানে কোন causal condition নাই, এমন কিছু থেকে মহাবিশ্ব অস্তিত্বে আসতে পারে না।

 

নিজেই নিজ থেকেঃ

নিজেই নিজ থেকে কি কিছু অস্তিত্বে আসা সম্ভব?  কোন কিছুকে অস্তিত্বে আসতে হলে তার পেছনে পূর্ব থেকে বিরাজমান একটি কারণ লাগে( pre-existing cause)। ধরা যাক B কে অস্তিত্বে আসতে হলে A কে লাগবে।এখানে A কে অবশ্যই B এর আগে থেকে অস্তিত্বে থাকতে হবে। B নিজেকে নিজে কখনই সৃষ্টি করতে পারবেনা।কারণ, তা করতে হলে B কে আগে থেকেই অস্তিত্বে থাকতে হবে।  আর B যদি আগে থেকেই অস্তিত্বে থেকে থাকে তাহলে তাকে আর অস্তিত্বে আসার দরকার নেই। সুতরাং মহাবিশ্ব নিজেই নিজেকে তৈরি করতে পারবে না।

 

সৃষ্ট কোন কিছু থেকেঃ

“Every contingent being has a cause.”

 ধরুন মহাবিশ্বের সৃষ্টির জন্য U1 দায়ী। এখন এই U1 নিজেই যদি সৃষ্ট হয়ে থাকে বা “contingent” হয়ে থাকে মানে অন্য কোন সত্তার উপর নিজের অস্তিত্বের জন্য নির্ভর করতে হয়,  ধরা যাক সেই কারণটি হল U2। এবার U2 এরও যদি একই অবস্থা হয় তাহলে এই কজ এন্ড ইফেক্টের চেইন অসীম পর্যন্ত চলতে থাকবে। আর এটা সম্ভব নয়।এটা সম্ভব হলে মহাবিশ্ব কখনই অস্তিত্বে আসতো না।

ব্যাপারটা একটি উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে। অনেক সময় তত্ত্ব কথার চেয়ে উদাহরণ আর এনালজি অনেক উপকারী হয়।

 

    চিন্তা করুন একজন স্নাইপার সুট করার জন্য তার পেছনে এক কমান্ডারের আদেশের অপেক্ষায় আছে। সেই কমান্ডার আবার তার পেছনে দাঁড়ানো অন্য এক কমান্ডারের আদেশের অপেক্ষায় আছে। এর পেছনে আরেক জন। এভাবে চলতে থাকলে অসীম পর্যন্ত কমান্ডারের চেইন চলতে থাকবে( infinite regress)।এর মানে হল ওই স্নাইপার কোন দিনই তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কমান্ডারের আদেশ পাবে না আর গুলিও করতে পারবে না। সুতরাং এই সম্ভাবনাও সম্ভব না।

 

আল্লাহ্ঃ  বরং তারা বিশ্বাস করে না”

 

সুতরাং কুরআনের করা এই আর্গুমেন্ট অনুযায়ী মহাবিশ্ব নিঃসন্দেহে আল্লাহর সৃষ্টি। এখানে, এই প্রশ্ন করারো কোন সুযোগ নেই যে- স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলো? মনে করুন স্নাইপারের উদাহরণটির কথা। এরকম ভাবলে অসীম পর্যন্ত চেইন চলতেই থাকবে। মহাবিশ্বকে অস্তিত্বে আসতে হলে এক জায়গায় এই কজাল চেইনকে থামতেই হবে যে কজ কন্টিনজেন্ট নয় নেসেসারি। এই প্রশ্ন করারও কোন সুযোগ নেই যে মহাবিশ্ব নিজেই নয় কেন চেইনের সেই শেষ কারণটি? এর উত্তর আগেই দেয়া হয়ে গেছে। মহাবিশ্ব  contingent এবং সসীম concrete being। এটা অসীম কাল থেকে থাকতে পারে না। একে অস্তিত্বে আসতেই হবে।

 

নোটঃ

[১] কুরআন, সুরা আত্ব-তূর, ৫২:৩৫-৩৬

[২] Bertrand Russell and F.C. Copleston, "The Existence of God," in The Existence of God, ed. with an Introduction by John Hick, Problems of Philosophy Series (New York: Macmillan & Co., 1964), p. 175.

[৩] David Hilbert. On the Infinite, in Philosophy of Mathematics, ed. with an Intro. by P. Benacerraf and H. Putnam. Prentice-Hall. 1964, page151.

[৪] This argument has been inspired by and adapted from Idris, J. (1994) The Contemporary Physicists and God’s Existence.

Available at: http://www.jaafaridris.com/the-contemporary-physicists-and-gods-existence/

 [Accessed 23rd November 2016].

[৫]http://www.hamzatzortzis.com/the-qurans-argument-for-gods-existence/#_edn3