ঋতুবতী নারীরা কি ইসলামে অবহেলিত?

নারী



 

ঋতুবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে ইসলামের মনোভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাস্তিক লেখক ড. হুমায়ুন আজাদ তার লিখিত “নারী” বইতে বলেছেন,

 

বাইবেল ও কোরআনে ও সব ধর্ম পুস্তকে ঋতুকে দেখা হয়েছে ভয়ের চোখে এবং ঋতুবতী নারীদের নির্দেশ করা হয়েছে নিষিদ্ধ ও দূষিত প্রাণীরুপে ............... ঋতুক্ষরণকে প্রতিটি ধর্ম ও আদিম সমাজ দেখেছে দানবিক ব্যপার রূপে

[হুমায়ুন আজাদ,নারী, অধ্যায়ঃ- লৈঙ্গিক রাজনীতি, পৃষ্ঠাঃ- ৪৪; (আগামী প্রকাশনী, ৩৬ বাংলাবাজার ঢাকা, ৩য় সংস্করণ, ষষ্ঠদশ মূদ্রণ, বৈশাখ ১৪১৯ ,মে ২০০৯)]।

 

পরিতাপের বিষয় হল, ড. আজাদ শুধুমাত্র ধারণা ও আনাড়ি অনুবাদকের সাহায্য নিয়েই বেশ জোরেশোরেই ইসলামের বিরুদ্ধে কলম চালিয়েছেন। তিনি হয়ত ভুলেই গেছেন যে শুধুমাত্র একজনের অনুবাদের উপর নির্ভর করে আর ধারণার বশবর্তী হয়ে সমালোচনা করাটা কোন জ্ঞানবান লোকের কাজ নয়। আরও মজার বিষয় হলো তিনি এই বিষয়টির সমালোচনা করতে গিয়ে একটি মাত্র কোরআনের আয়াতের সাহায্য নিয়েছেন তাও আবার ভুল অনুবাদের, কিন্তু তিনি নবী (ﷺ) এর হাদিস থেকে এই বিষয়ে কোন দলিল পেশ করতে পারেন নি। তার এই মিথ্যাচার দেখে আল্লাহ্‌ তাআলার একটি বানীর কথা মনে পড়ে গেল। মহান আল্লাহ্‌ বলেন,

 

وَمِنَ النَّاسِ مَن يُجَادِلُ فِي اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَلَا هُدًى وَلَا كِتَابٍ مُّنِيرٍ

ثَانِيَ عِطْفِهِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ ۖ لَهُ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ ۖ وَنُذِيقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَذَابَ الْحَرِيقِ
মানুষের মধ্য কেউ কেউ আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে; তাদের কাছে না আছে জ্ঞান,না আছে পথনির্দেশ, না আছে কোন দীপ্তিমান কিতাব। সে বিতণ্ডা করে ঘাড় বাকিয়ে লোকদেরকে আল্লাহর পথ হতে ভ্রষ্ট করার জন্য তার জন্যে রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে দহন যন্ত্রণা আস্বাদন করাব

( সুরা হাজ্জঃ ৮-৯ আয়াত)

 

আমাদের আলোচনার শুরুতেই চলুন আমরা হায়েয (Menstruation) সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেই। 

হায়েযের সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রাহি) বলেন,

 

হায়েযের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে কোন বস্তু নির্গত ও প্রবাহিত হওয়া। আর শরীয়তের পরিভাষায় হায়েয বলা হয় ঐ প্রাকৃতিক রক্তকে, যা বাহ্যিক কোন কার্যকারণ ব্যাতীতই নির্দিষ্ট সময়ে নারীর যৌনাঙ্গ দিয়ে নির্গত হয়। হায়েয প্রাকৃতিক রক্ত, অসুস্থতা আঘাত পাওয়া, পড়ে যাওয়া এবং প্রসবের সাথে এর কোন সম্পর্কে নেই। এই প্রাকৃতিক রক্ত নারীর অবস্থা ও পরিবেশ- পরিস্থিতির বিভিন্নতার কারণে নানা রকম হয়ে থাকে এবং এই কারণেই ঋতুস্রাবের দিক থেকে নারীদের মধ্যে বেশ পার্থক্য দেখা যায়।

{উসাইমিন, মুহাম্মাদ বিন সালেহ, নারীর প্রাকৃতিক রক্তস্রাব, অনুবাদঃ মীযানুর রহমান আবুল হোসাইন, পৃষ্ঠাঃ ০৪; (ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদি আরব, ১৪২৯ হি)}।

 

এইবার চলুন মেডিক্যাল সাইন্স অনুসারে আমরা দেখি যে হায়েয তথা রজঃস্রাব (Menstruation) কাকে বলে।

 

হায়েয হলো উচ্চতর প্রাইমেট (Primate) বর্গের স্তন্যপায়ী (Mammalian) স্ত্রী একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যা প্রজননের সাথে সম্পর্কিত। প্রতি মাসে এটি হয় বলে বাংলায় এটিকে মাসিক নামেও অভিহিত করা হয়। প্রজননের উদ্দেশ্যে নারীদের ডিম্বাশয়ে (Ovum) ডিম্বস্ফোটন হয় এবং তা ফ্যালোপিয়ান টিউব (Fallopeian Tube) দিয়ে নারীদের জরায়ুতে চলে আসে। এই পরিস্ফুটিত ডিম্ব জরায়ুতে ৩-৪ দিন অবস্থান করে। এই সময়ের মধ্যে যদি কোন শুক্রানু নারীদেহের জরায়ুতে প্রবেশ না করে, তাহলে সেই ডিম্বাণু নষ্ট হয়ে যায়, সেই সাথে জরায়ুর এন্ডোমেট্রিয়াম (Endometrium) স্তর ভেঙ্গে পড়ে। আর যদি পুরুষের শুক্রাণু (Sperm) সেখানে পৌছে তাহলে তা নিষিক্ত হয়ে যায় এবং ভ্রূণের (Zygote) সূচনা ঘটে। এন্ডোমেট্রিয়াম এর ভঙ্গ ঝিল্লি, সঙ্গের শ্লেষ্মা ও এর রক্তবাহ থেকে উৎপন্ন রক্তপাত সব মিশে তৈরি তরল এবং তার সাথে তঞ্চিত এবং অর্ধ তঞ্চিত তরল কয়েকদিন ধরে লাগাতার যৌনি পথে নির্গত হয়। এই ক্ষরণই হায়েয নামে পরিচিত। কখনো কখনো একে গর্ভস্রাব হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।। যদি জরায়ুতে অবমুক্ত ডিম্বটি পুরুষের শুক্রানো দ্বারা নিষিক্ত হয়ে Implantation শুরু হয় তবে আর হায়েয হয় না। তাই মাসিক রজস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়াকে মেয়েদের গর্ভধারণের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। রজস্রাব যুবতীদের ক্ষেত্রে সাধারণত ২১-৪৫ দিন পর পর ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ২১-৩১ দিন পর পর সংগঠিত হয়। এটি সাধারণত মেয়েদের ১১ বা ১৩ বছর বয়স থেকে শুরু হয়। মহিলাদের হায়েয একেবারে বন্ধ হয়ে যায় যখন তাদের Menopause শুরু হয়। তাদের এই রক্তপাত সাধারণত ২-৭ দিন স্থায়ী হয়।

[Frederick R. Bailey, A Text Book of Histology, (William Wood and Company, New York, 3rd ed.)

“Menstruation and the menstrual cycle fact sheet”. Office of Women’s Health. December 23, 2014. Retrieved 25 June 2015.]


ড. আজাদ তার বইতে হায়েয বিষয়ক ইসলামের বিধানের সমালোচনা করতে গিয়ে একটি মাত্র আয়াতের সাহায্য নিয়েছেন। আয়াতটি হল,

 

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ ۖ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىٰ يَطْهُرْنَ ۖ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ [٢:٢٢٢]

আর তারা তোমাকে হায়েজ সম্পর্কে প্রশ্ন করে,বল তা কষ্টকর। সুতরাং তোমরা হায়েজকালে স্ত্রী সঙ্গম (যৌনমিলন) বর্জন করবে এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী সঙ্গম করবে না। অতঃপর তারা যখন পবিত্র হবে তখন তাদের নিকট ঠিক সে ভাবে গমন করবে যেভাবে আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন

(সুরা বাকারাহঃ ২২২ আয়াত)

 

চলুন আমরা এই আয়াতের শানে-নুযূলটি একটু জেনে নেই। আয়াতটি মূলত ইহুদীদের লক্ষ্য করে নাযিল হয়। তারা হায়েযা মেয়েলোকদের সাথে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করত। তাদের কে এই সময়ে ঘোড়ার আস্তাবলে রেখে দিত, ভালোমত খাবার গ্রহণ করতে দিত না, সমাজের লোকেরা তাদের সাথে এই সময়টাতে দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ রাখতো। এভাবে ঋতু চলাকালীন সময়ে মেয়েলোকেরা অবহেলিত হত ইহুদিদের সমাজে। এমনকি মক্কার পৌত্তলিকরাও ঋতুবতী মহিলাদের কে অবজ্ঞা করত, তাদের খারাপ চোখে দেখত, তাদেরকে এই সময়ে আলাদা ঘরে রাখত। আবার তাদের সাথে এই সময়ে যৌনমিলনও করত তারা। তখন সাহাবারা তাদের স্ত্রীদের সাথে এই সময়ে কি ধরণের আচরণ প্রদর্শন করবেন তা আল্লাহর রাসুল (ﷺ) এর কাছে জানতে চাইলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়, যা নিম্নের হাদিস দ্বারা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।

 

وَحَدَّثَنِي زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ، حَدَّثَنَا ثَابِتٌ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ الْيَهُودَ، كَانُوا إِذَا حَاضَتِ الْمَرْأَةُ فِيهِمْ لَمْ يُؤَاكِلُوهَا وَلَمْ يُجَامِعُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ فَسَأَلَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى ‏{‏ وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ‏}‏ إِلَى آخِرِ الآيَةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ اصْنَعُوا كُلَّ شَىْءٍ إِلاَّ النِّكَاحَ ‏"‏ ‏.‏ فَبَلَغَ ذَلِكَ الْيَهُودَ فَقَالُوا مَا يُرِيدُ هَذَا الرَّجُلُ أَنْ يَدَعَ مِنْ أَمْرِنَا شَيْئًا إِلاَّ خَالَفَنَا فِيهِ فَجَاءَ أُسَيْدُ بْنُ حُضَيْرٍ وَعَبَّادُ بْنُ بِشْرٍ فَقَالاَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ الْيَهُودَ تَقُولُ كَذَا وَكَذَا ‏.‏ فَلاَ نُجَامِعُهُنَّ فَتَغَيَّرَ وَجْهُ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَتَّى ظَنَنَّا أَنْ قَدْ وَجَدَ عَلَيْهِمَا فَخَرَجَا فَاسْتَقْبَلَهُمَا هَدِيَّةٌ مِنْ لَبَنٍ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَأَرْسَلَ فِي آثَارِهِمَا فَسَقَاهُمَا فَعَرَفَا أَنْ لَمْ يَجِدْ عَلَيْهِمَا ‏.

যুহায়র ইবন হারব (র)আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, ইয়াহুদীরা তাদের মহিলাদের হায়েয হলে তার সঙ্গে এক সাথে আহার করত না এবং এক ঘরে বাস করত না । সাহাবায়ে কিরাম এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ () -কে জিজ্ঞেস করলেন । তখন আল্লাহ তায়াআলা এ আয়াত নাযিল করলেন:-তারা তোমার কাছে হায়েয সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে । বলে দাও যে, তা হলো কষ্টদায়ক ...................

এরপর রাসুলুল্লাহ () বললেন, তোমরা (সে সময় তাদের সাথে) শুধু সহবাস ছাড়া অন্যান্য সব কাজ কর। এ খবর ইয়াহুদীদের কাছে পৌছলে তারা বলল, এ লোকটি সব কাজেই কেবল আমাদের বিরোধিতা করতে চায়। অত:পর উসায়দ ইবন হুযায়র (রা) ও আববাদ ইবন বিশর (রা) এসে বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ ! ইয়াহুদীরা এ রকম এ রকম বলছে । আমরা কি তাদের সাথে (হায়িয অবস্হায়) সহবাস করব না? রাসুলুল্লাহ () -এর চেহারা মূবারক বিবর্ণ হয়ে গেল । এতে আমরা ধারণা করলাম যে,তিনি তাদের ওপর ভীষণ রাগান্বিত হয়েছেন। তারা (উভয়ে) বেরিয়ে গেল। ইতিমধ্যেই রাসুলুল্লাহ () এর কাছে দুধ হাদিয়া এল। তিনি তাদেরকে ডেকে আনার জন্য লোক পাঠালেন। (তারা এলে) তিনি তাদেরকে দুধ পান করালেন। তখন তারা বূঝল যে, তিনি তাদের ওপর রাগ করেননি।

{মুসলিম, আবুল হোসাইন ইবনুল হাজ্জাজ, আস-সহীহ, অধ্যায়ঃ (৩) হায়েজ সম্পর্কিত বর্ণনা, ২/৬০১; ইবনু কাসীর, ইসমাঈল ইবনু উমার, তাফসীরুল কোরআনীল আযীম, ১/৬০৯; ইবনু হাজার আসকালানী, বুলুগুল মারাম, অধ্যায়ঃ ঝতুবতী মহিলাদের যে সকল কাজ বৈধ, হাদিস নংঃ ১৪৩ (তাওহীদ পাবলিকেশন, ৯০, হাজী আব্দুল্লাহ সরকার লেন, বংশাল, ঢাকা-১১০০, ১ম প্রকাশ, আগস্ট, ২০১৩)}

 

কোরআনের এই আয়াতে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নারীদের হায়েজ কালীন সময়ের কথা বর্ণনা করেছেন। হায়েযকালীন সময় যে তাদের জন্য কষ্টকর, যন্ত্রনাদায়ক তা উল্লেখ করেছেন এবং সেই সময়ে তাদের সাথে যৌনমিলন করতে নিষেধ করেছেন। ডঃ আজাদ একটি যায়গায় মারাক্তক ভুল করেছেন আর তা হলো এই আয়াতের ক্ষেত্রে “আযা” (أَذًى) শব্দের তিনি ভুল অর্থ গ্রহণ করেছেন তার “নারী” বইতে। আর ভুল অর্থ গ্রহণ করেই তিনি ইসলামের সমালোচনা করেছেন কয়েক পৃষ্ঠা ব্যাপী। চলুন প্রসিদ্ধ অভিধান থেকে দেখে নেয়া যাক যে “আযা” শব্দের অর্থ কি কি হতে পারে?

 

বিশ্ববিখ্যাত আরবী টু ইংরেজী অভিধান “A dictionary of modern written Arabic language” অনুযায়ী أَذًى শব্দের অর্থ গুলো হলোঃ

 

To suffer damage, be harmed, hurt, wrong, to molest, annoy, irritable, trouble.

{Hans wehr, Edited by:- J Milton Cowan, A dictionary of modern written arabic, p.12; (Spoken language servibe, Inc.,Ithaca, New York, 3rd edition,1976)}

 

“Al-Mawid ( A modern Arabic to English dictionary)” অনুসারে আযা” (أَذًى) শব্দের অর্থ হলোঃ

harm, damage, injury, wrong, detriment, lesion, grievance, nuisance, annoyance, harassment.

{Dr. Rohi Baalbaki, Al-Mawrid, p.67; ( Dar-el-ilm, Lilmalayin, seventh edition, Beirut, Lebanon,1995)}

 

আল-মুজামুল ওয়াফীঅনুসারে আযা” (أَذًى) শব্দের অর্থ হলোঃ

কষ্ট, ক্ষতি, অনিষ্ঠ, আঘাত।

{ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, আল-মুজামুল ওয়াফী, পৃষ্ঠাঃ ৬২; (রিয়াদ প্রকাশনী, ৩৪ নর্থ ব্রুকহল রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা, ১৩শ সংস্করণ, ২০১৩)}

 

আপনি লক্ষ্য করুন কোন অভিধানেই কিন্তু “আযা” (أَذًى) শব্দের অর্থ দানবিক, অপয়া, পশুর মত, নিষিদ্ধ, দূষিত প্রাণী ইত্যাদি নেই। ইসলামে নারীদের ঋতুকালীন অবস্থায় যে তাদের কে অবহেলা করা হয় এই বিধানটি ডঃ আজাদ কোন দলীলের (কোরআন ও সুন্নাহ) মাধ্যমে গ্রহণ করেছেন তা পরিষ্কার নয়। কেননা এই আরবী শব্দের অর্থগুলো আমরা প্রসিদ্ধ অভিধান গ্রন্থ থেকে দেখেছি। সেখানে কোথাও এই কথা বলা নেই যে, “আযা” (أَذًى) শব্দের অর্থ অপয়া, দানবিক ইত্যাদি। আর আল কোরআনে এমন কোন আয়াতও নেই যার দ্বারা ডঃ আজাদের এই কল্পনাপ্রসূত দাবীর সত্যতা পরিলক্ষিত হয়।

 

এখন আমরা রাসূল (ﷺ) এর সহীহ হাদিস থেকে ঋতুবতী নারীদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান নিয়ে আলোচনা পেশ করব ইনশাআল্লাহ।

 

আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ঋতুচলাকালীন সময়ে তার স্ত্রীদের সাথে কোনরূপ অবজ্ঞাভাব প্রকাশ করতেন না বরং এ সময় তাঁর (ﷺ) আচরণ ছিল স্বাভাবিক। তিনি (ﷺ) ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে একই পাত্রে খাবার খেয়েছেন, একই পাত্র থেকে পানি নিয়ে গোসল করেছেন, একই বিছানায় শয়ন করেছেন, প্রাত্যহিক কাজে তাদের সাহায্য গ্রহণ করেছেন, ঋতুবতী স্ত্রীর দ্বারা নিজের মাথা আঁচড়িয়ে নিয়েছেন, তাদেরকে পাশে রেখে কোরআন তিলাওয়াত করেছেন, সালাত আদায় করেছেন। আপনি শুনলে হয়ত অবাক হবেন যে, ঋতুবতী অবস্থায় মা আয়েশা (রাযি) যে দিক থেকে মুখ লাগিয়ে পানি পান করতেন, রাসূল (ﷺ) ও ঠিক সে দিকে মুখ লাগিয়ে পানি পান করতেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হাড় কে ঐ দিক থেকেই চিবাতেন যে দিক থেকে আয়িশা (রাযিঃ) ঋতুবতী অবস্থায় চিবাতেন । আমরা সহীহ হাদিস থেকে আপনার সামনে কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি।

 

ঋতুবতী নারীদের সাথে এক বিছানায় শোয়াঃ

 

আল্লাহর রাসুল (ﷺ) তার সহধর্মিণীদের সাথে ঋতুকালীন সময়ে একই বিছানায় শয়ন করতেন কিন্তু কোন সঙ্কোচবোধ করতেন না। তাদেরকে অপয়া মনে করতেন না, তাদেরকে অশুচি মনে করতেন না। যা নিম্নোক্ত সহিহ হাদিসসমূহ দ্বারা পরিষ্কার ভাবে প্রতীয়মান হয়।

 

حَدَّثَنَا الْمَكِّيُّ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ حَدَّثَنَا هِشَامٌ، عَنْ يَحْيَى بْنِ أَبِي كَثِيرٍ، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، أَنَّ زَيْنَبَ ابْنَةَ أُمِّ سَلَمَةَ، حَدَّثَتْهُ أَنَّ أُمَّ سَلَمَةَ حَدَّثَتْهَا قَالَتْ، بَيْنَا أَنَا مَعَ النَّبِيِّ، صلى الله عليه وسلم مُضْطَجِعَةً فِي خَمِيصَةٍ إِذْ حِضْتُ، فَانْسَلَلْتُ فَأَخَذْتُ ثِيَابَ حِيضَتِي قَالَ ‏ "‏ أَنُفِسْتِ ‏"‏‏.‏ قُلْتُ نَعَمْ‏.‏ فَدَعَانِي فَاضْطَجَعْتُ مَعَهُ فِي الْخَمِيلَةِ‏.‏

উম্মে সালমা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি নবী () এর সাথে একই চাদরের নীচে শুয়ে ছিলাম। হঠাৎ আমার হায়েয দেখা দিলে আমি চুপি চুপি বেরিয়ে গিয়ে হায়েযের কাপড় পড়ে নিলাম। তিনি বললেনঃ তোমার কি নিফাস দেখা দিয়েছে? আমি বললাম হ্যা। তখন তিনি আমাকে ডাকলেন। আমি তার সঙ্গে চাদরের ভিতর শুয়ে পড়লাম।

[বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহিহ, অধ্যায়ঃ হায়য, পরিচ্ছেদঃ (২০৭) হায়য অবস্থায় স্ত্রীর সাথে মিলামেশা করা, ১/২৯৪ আরও দেখুন, ১/৩১৬,৩১৭; মুসলিম, আবুল হোসাইন ইবনুল হাজ্জাজ, আস-সহীহ, অধ্যায়ঃ (৩), হায়েজ সম্পর্কিত বর্ণনা, ২/৫৮১ , আহমাদ ইবনু হাম্বল, মুসনাদে আহমদ, অধ্যায়ঃ হায়য-ইস্তিহাযা ও নিফাস, পরিচ্ছেদঃ (৪), ...... তাদের সাথে শোয়া ও খাওয়া দাওয়া বৈধ, ১/৩২৬, ইবনু মাজাহ, মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযিদ, আস-সুনান ১/৬৩৭।]

 

ঋতুবতী নারীদের সাথে যৌনমিলন ছাড়া সব ধরণের মেলামেশা করাঃ

 

এই সময়টাতে যৌনমিলন ছাড়া তাদের সাথে সব ধরণের মেলামেশা করা যায়। তাদের সাথে খাবার খাওয়া, চলাফেরা, তাদের সাথে বসা, স্বাভাবিক সকল কাজ কর্ম পরিচালনা করা, প্রভৃতি কোন কাজই ইসলাম এই সময়ে নিষেধ করে নি। বরং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এই সময়ে তার স্ত্রীদের দ্বারা মাথা আঁচড়াতেন, তাদের সাথে যৌনমিলন ছাড়া সব কিছুই করতেন, তাদের প্রাত্যহিক কর্মে সহায়তা করতেন এবং সেই সাথে তিনি তার সাহাবাদের উৎসাহ দিতেন তাদের স্ত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহার করার জন্য।

 

وَحَدَّثَنِي زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ، حَدَّثَنَا ثَابِتٌ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ الْيَهُودَ، كَانُوا إِذَا حَاضَتِ الْمَرْأَةُ فِيهِمْ لَمْ يُؤَاكِلُوهَا وَلَمْ يُجَامِعُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ فَسَأَلَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى ‏{‏ وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ‏}‏ إِلَى آخِرِ الآيَةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ اصْنَعُوا كُلَّ شَىْءٍ إِلاَّ النِّكَاحَ ‏

যুহায়র ইবন হারব (র)আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, ইয়াহুদীরা তাদের মহিলাদের হায়েয হলে তার সঙ্গে এক সাথে আহার করত না এবং এক ঘরে বাস করত না। সাহাবায়ে কিরাম এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ()-কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করলেন: তারা তোমার কাছে হায়েয সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও যে, তা হলো কষ্টদায়ক। সুতরাং হায়েয অবস্হায় তোমরা মহিলাদের থেকে পৃথক থাকবে……

এরপর রাসুলুল্লাহ () বললেন, তোমরা (সে সময় তাদের সাথে) শুধু সহবাস ছাড়া অন্যান্য সব কাজ কর ।

[মুসলিম, আবুল হোসাইন ইবনুল হাজ্জাজ, আস-সহীহ, অধ্যায়ঃ (৩) হায়েজ সম্পর্কিত বর্ণনা, ২/৫৮৯, ৫৯০; আলবানী, মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন, সহীহ আত-তিরমিযী, ১/১৩২; আহমাদ ইবনু হাম্বল, মুসনাদে আহমদ, অধ্যায়ঃ হায়য-ইস্তিহাযা ও নিফাস, পরিচ্ছেদঃ (৪), ...... তাদের সাথে শোয়া ও খাওয়া দাওয়া বৈধ, ১/৩২৪, আলবানী, মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন, সহীহ আত-তিরমিযী, ১/১৩২।]

 

وَعَنْ أَنَسٍ ‏- رضى الله عنه ‏- { أَنَّ اَلْيَهُودَ كَانُوا إِذَا حَاضَتْ اَلْمَرْأَةُ لَمْ يُؤَاكِلُوهَا, فَقَالَ اَلنَّبِيُّ ‏- صلى الله عليه وسلم ‏- "اِصْنَعُوا كُلَّ شَيْءٍ إِلَّا اَلنِّكَاحَ

আনাস (রাযি) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ইয়াহুদী লোকেরা তাদের হায়েযা স্ত্রীর সাথে পানাহার করা পরিত্যাগ করতো। নবী () বলেনঃ তোমরা যৌনমিলন ছাড়া তাদের সাথে সবই করবে।

[মুসলিম, আবুল হোসাইন ইবনুল হাজ্জাজ, আস-সহীহ, অধ্যায়ঃ (৩), হায়েজ সম্পর্কিত বর্ণনা, ২/৫৮৬; বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহিহ, অধ্যায়ঃ হায়য,পরিচ্ছেদঃ (২০৭), হায়য অবস্থায় স্ত্রীর সাথে মিলামেশা করা, ১/২৯৬,২৯৭, ইবনু হাজার আসকালানী, বুলুগুল মারাম, অধ্যায়ঃ ঝতুবতী মহিলাদের যে সকল কাজ বৈধ, হাদিস নংঃ ১৪৩, হাদিস সহীহ।]

 

ঋতুবতী স্ত্রীকে আলিঙ্গন করাঃ

 

রাসূল (ﷺ) তার ঋতুবতী স্ত্রীকে আলিঙ্গন করতেন। তাদের গায়ের সাথে গাঁ মিশিয়ে শুতেন, এই সময় তাঁর ঝতুবতী স্ত্রীর যৌনাঙ্গে একটি কাপড়ের পট্টি বাধা থাকতো। যা নিম্নোক্ত হাদিস গুলোর দ্বারা বুঝা যায়।

 

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، عَنِ الأَسْوَدِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ كَانَتْ إِحْدَانَا إِذَا حَاضَتْ أَمَرَهَا النَّبِيُّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ أَنْ تَأْتَزِرَ بِإِزَارٍ ثُمَّ يُبَاشِرُهَا

আয়িশাহ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের কেউ হায়েযগ্রস্ত হলে নাবী () তাকে তার (লজ্জাস্থানে) পাজামা শক্তভাবে বাঁধার নির্দেশ দিতেন, অতঃপর তাকে আলিঙ্গন করতেন।

[বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহিহ, অধ্যায়ঃ হায়য,পরিচ্ছেদঃ (২০৭), হায়য অবস্থায় স্ত্রীর সাথে মিলামেশা করা, ১/২৯৬, মালিক বিন আনাস, আল-মুয়াত্তা, অধ্যায়ঃ (২) পবিত্রতা অর্জন, পরিচ্ছেদঃ (২৬) স্ত্রী ঋতুমতী থাকিলে ......... , ১/৯৪, ইবনু মাজাহ, মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযিদ, আস-সুনান, অধ্যায়ঃ পবিত্রতা ও তার পন্থাসমূহ, ১/৬৩৫,৬৩৬।]

 

ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে একই পাত্রে খাবার খাওয়াঃ

 

আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এই সময়ে তাদের কে এক সাথে নিয়ে, একই থালায় খাবার গ্রহণ করতেন। শুধু এক সাথে নিয়ে খাবারই নয় আল্লাহ্‌র রাসুল (ﷺ) ঐ দিকে ঠোঁট লাগিয়ে পানি খেতেন যেদিক দিয়ে মা আয়িশা (রাযিঃ) হায়িজা অবস্থায় পানি খেতেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হাড় কে ঐ দিক থেকেই চিবাতেন যে দিক থেকে আয়িশা (রাযিঃ) ঋতুবতী অবস্থায় চিবাতেন । নিম্নোক্ত সহিহ হাদিস দ্বারা ইসলামের এই আচরণ গুলো অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হয়।

 

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، وَزُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، قَالاَ حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، عَنْ مِسْعَرٍ، وَسُفْيَانَ،

عَنِ الْمِقْدَامِ بْنِ شُرَيْحٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ كُنْتُ أَشْرَبُ وَأَنَا حَائِضٌ، ثُمَّ أُنَاوِلُهُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَيَضَعُ فَاهُ عَلَى مَوْضِعِ فِيَّ فَيَشْرَبُ وَأَتَعَرَّقُ الْعَرْقَ وَأَنَا حَائِضٌ ثُمَّ أُنَاوِلُهُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَيَضَعُ فَاهُ عَلَى مَوْضِعِ فِيَّ ‏.‏ وَلَمْ يَذْكُرْ زُهَيْرٌ فَيَشْرَبُ ‏.

আয়েশা (রাযি) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ আমি ঋতুবতী অবস্থায় পানি পান করতাম এবং পরে নবী () কে অবশিষ্টটুকু প্রদান করলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতাম তিনিও সেই স্থানেই মুখ লাগিয়ে পান করতেন। আবার আমি ঋতুবতী অবস্থায় হাড় খেয়ে তা নবী () কে দিলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়েছিলাম তিনি সেখানে মুখ লাগিয়ে খেতেন।

[মুসলিম, আবুল হোসাইন ইবনুল হাজ্জাজ, আস-সহীহ, অধ্যায়ঃ (৩) হায়েজ সম্পর্কিত বর্ণনা, ২/৫৯৯, আহমাদ ইবনু হাম্বল, মুসনাদে আহমদ, অধ্যায়ঃ হায়য-ইস্তিহাযা ও নিফাস, অনুচ্ছেদঃ ঝতুবতী মহিলাদের সাথে খাওয়া দাওয়া ........ , ১/৩২৭, ইবনু মাজাহ, মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযিদ, আস-সুনান, ১/৬৩৪, আবু দাউদ, সুলাইমান ইবনু আশয়াস, আস-সুনান, ১/২৫৯ ।]

 

حَدَّثَنَا عَبَّاسٌ الْعَنْبَرِيُّ، وَمُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الأَعْلَى، قَالاَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، حَدَّثَنَا مُعَاوِيَةُ بْنُ صَالِحٍ، عَنِ الْعَلاَءِ بْنِ الْحَارِثِ، عَنْ حَرَامِ بْنِ مُعَاوِيَةَ، عَنْ عَمِّهِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ سَعْدٍ، قَالَ سَأَلْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم عَنْ مُوَاكَلَةِ الْحَائِضِ فَقَالَ

আবদুলাহ ইবনু সাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি হায়িযা নারীর সাথে একত্রে পানাহাযর সম্পর্কে নাবী () কে প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেনঃ তার সাথে খাও।

[আলবানী, মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন, সহীহ আত-তিরমিযী, ১/১৩৩, ইবনু মাজাহ, মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযিদ, আস-সুনান‌ ১/৬৫১, নাসাঈ, আহমাদ ইবনু শুয়াইব, আস-সুনান, ১/৭৬৮, ; ঈমাম আবূ ‘ঈসা (রাহি) বলেন, এ হাদীসটি হাসান গরীব, শাইখ আলবানী বলেনঃ হাদীস সহীহ ।]

 

ঋতুবতী স্ত্রীর দ্বারা মাথা আঁচড়িয়ে নেয়াঃ

 

আল্লাহ্‌র নবী (ﷺ) তাঁর ঋতুবতী স্ত্রীদের দিয়ে তাঁর মাথাকে পরিপাটি করে নিতেন। এমনকি তিনি যখন মসজিদে ইতিকাফ করতেন তখনও মা আয়িশা (রাযিঃ) রাসুলুল্লাহর মাথা আচড়িয়ে পরিপাটি করে দিতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে অশুচি, অপয়া বা পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট রূপে গণ্য করেননি। যা আমরা নিম্নে উল্লেখিত সহীহ হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণ পাই।

 

حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ مُوسَى، قَالَ أَخْبَرَنَا هِشَامُ بْنُ يُوسُفَ، أَنَّ ابْنَ جُرَيْجٍ، أَخْبَرَهُمْ قَالَ أَخْبَرَنِي هِشَامٌ، عَنْ عُرْوَةَ، أَنَّهُ سُئِلَ أَتَخْدُمُنِي الْحَائِضُ أَوْ تَدْنُو مِنِّي الْمَرْأَةُ وَهْىَ جُنُبٌ فَقَالَ عُرْوَةُ كُلُّ ذَلِكَ عَلَىَّ هَيِّنٌ، وَكُلُّ ذَلِكَ تَخْدُمُنِي، وَلَيْسَ عَلَى أَحَدٍ فِي ذَلِكَ بَأْسٌ، أَخْبَرَتْنِي عَائِشَةُ أَنَّهَا كَانَتْ تُرَجِّلُ ـ تَعْنِي ـ رَأْسَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهِيَ حَائِضٌ، وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حِينَئِذٍ مُجَاوِرٌ فِي الْمَسْجِدِ، يُدْنِي لَهَا رَأْسَهُ وَهْىَ فِي حُجْرَتِهَا، فَتُرَجِّلُهُ وَهْىَ حَائِضٌ‏.

উরওয়া (র) থেকে বর্ণিত। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, ঋতুবতী স্ত্রী কি স্বামীর খেদমত করতে পারবে? অথবা গোসল ফরয হওয়ার অবস্থায় কি স্বামীর নিকটবর্তী হতে পারে? উরওয়া জবাব দিলেন এ সবই আমার কাছে সহজ। এ ধরণের সকল মহিলাই স্বামীর খেদমত করতে পারে। এ ব্যাপারে কারো অসুবিধা থাকার কথা নয়। আমাকে আয়িশা (রাযি) বলেছেনঃ তিনি ঋতুবতী অবস্থায় রাসুলুল্লাহ () এর চুল আঁচড়ে দিতেন। আর রাসুলুল্লাহ () মুতাকিফ অবস্থায় মসজিদ থেকে তার হুজরার দিকে মাথাটা বাড়িয়ে দিতেন। তখন তিনি মাথার চুল আঁচড়াতেন অথচ তিনি ছিলেন ঋতুবতী।

[বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহিহ,অধ্যায়ঃ হায়য,পরিচ্ছেদঃ (২০৪), হায়েযের সময় স্বামীর মাথা ধুয়ে দেয়া, ১/২৯২।]

 

স্ত্রীর সাথে একই পাত্রে গোসল করাঃ

 

হায়েজা স্ত্রীদের সাথে একই পাত্রে পানি নিয়ে একই গোসলখানায় গোসল করা, ইসলাম সমর্থিত বিষয়, যা আমরা নবী (ﷺ) এর সহীহ হাদিস থেকে প্রমাণ পাই।

 

َدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى، حَدَّثَنَا مُعَاذُ بْنُ هِشَامٍ، حَدَّثَنِي أَبِي، عَنْ يَحْيَى بْنِ أَبِي كَثِيرٍ، حَدَّثَنَا أَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أَنَّ زَيْنَبَ بِنْتَ أُمِّ سَلَمَةَ، حَدَّثَتْهُ أَنَّ أُمَّ سَلَمَةَ حَدَّثَتْهَا قَالَتْ، بَيْنَمَا أَنَا مُضْطَجِعَةٌ، مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي الْخَمِيلَةِ إِذْ حِضْتُ فَانْسَلَلْتُ فَأَخَذْتُ ثِيَابَ حَيْضَتِي فَقَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ أَنُفِسْتِ ‏"‏ ‏.‏ قُلْتُ نَعَمْ ‏.‏ فَدَعَانِي فَاضْطَجَعْتُ مَعَهُ فِي الْخَمِيلَةِ ‏.‏ قَالَتْ وَكَانَتْ هِيَ وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَغْتَسِلاَنِ فِي الإِنَاءِ الْوَاحِدِ مِنَ الْجَنَابَةِ ‏

উম্মে সালামা (রাযি) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ একদিন আমি রাসুলুল্লাহ () এর সঙ্গে একই বিছানায় ছিলাম। এমন সময়ে আমার ঋতু দেখা দিলে আমি....... .......................... ।

উম্মে সালামা একথাও বলেছেন যে, তিনি এবং রাসুলুল্লাহ () (নাপাক অবস্থায়) এক সাথে একই পাত্র হতে পানি নিয়ে পবিত্রতার জন্য গোসল করতেন।

[বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহিহ, ২/৫৯০।]

 

প্রাত্যহিক কোন কাজে ঋতুবতী স্ত্রীর সাহায্য নেওয়াঃ

 

উল্লেখিত কাজ ছাড়াও আপনি আপনার প্রত্যহিক যে কোন ধরণের কাজে আপনার ঋতুবতী স্ত্রীর সহায়তা নিতে পারবেন।

 

وَحَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى، وَأَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ وَأَبُو كُرَيْبٍ قَالَ يَحْيَى أَخْبَرَنَا وَقَالَ الآخَرَانِ، حَدَّثَنَا أَبُو مُعَاوِيَةَ، عَنِ الأَعْمَشِ، عَنْ ثَابِتِ بْنِ عُبَيْدٍ، عَنِ الْقَاسِمِ بْنِ مُحَمَّدٍ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ نَاوِلِينِي الْخُمْرَةَ مِنَ الْمَسْجِدِ ‏"‏ ‏.‏ قَالَتْ فَقُلْتُ إِنِّي حَائِضٌ ‏.‏ فَقَالَ ‏"‏ إِنَّ حَيْضَتَكِ لَيْسَتْ فِي يَدِكِ ‏"‏

আয়িশা (রাযি) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ রাসুলুল্লাহ () ইতিকাফ থাকা অবস্থায় মসজিদ থেকে আমাকে (হাত বাড়িয়ে) জায়নামাযটি দেয়ার জন্যে আদেশ করলেন। আমি বললামঃ আমি তো ঋতুবতী। তিনি আবার বললেনঃ তা আমাকে দাও, ঋতু তো আর হাতে লেগে নেই।

[মুসলিম, আবুল হোসাইন ইবনুল হাজ্জাজ, অধ্যায়ঃ (৩), হায়েজ সম্পর্কিত বর্ণনা, ২/৫৯৭,৫৯৮; আহমাদ ইবনু হাম্বল, মুসনাদে আহমদ, অধ্যায়ঃ হায়য-ইস্তিহাযা ও নিফাস, পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদঃ (৫), ঋতুবতী মহিলার কোলে কুরআন তিলাওয়াত করা ......... , ১/৩২৮, আলবানী, মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন, সহীহ আত-তিরমিযী, ১/১৩৪, ইবনু মাজাহ, মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযিদ, আস-সুনান, ১/৬৩২ ।]

 

আমরা ঋতুবতী নারীর সাথে রাসূল (ﷺ) এর আচরণ কেমন ছিল তা দেখলাম। আমরা রাসূল (ﷺ) এর সুন্নাহ থেকে দেখলাম যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ঋতুবতী স্ত্রীদের সাথে কঠোর কিংবা বিদ্রুপাত্মক আচরণ প্রদর্শন করেননি। বরং তিনি এই সময়ে স্ত্রীদের সাথে বরাবরের ন্যায় বন্ধুত্বপূর্ন আচরণই করেছেন। 
 
ঋতুবতী স্ত্রীদের সাহায্যে তিনি মাথা আচড়িয়েছেন। তাদের সাথে একই পাত্রে খাবার খেয়েছেন, গোসল করেছেন। তাদেরকে নিয়ে বিছানায় একসাথে শয়ন করেছেন। রাসূল (ﷺ) শুধু প্রাত্যহিক কাজেই ঋতুবতী স্ত্রীদের সহায়তা নিতেন না বরং তিনি তাঁর ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে রাত্রীযাপনকালীন সময় কিয়ামুল লাইল আদায় করতেন। কিয়ামুল লাইল আদায় করার সময় তাঁর ঋতুবতী স্ত্রী সিজদার জায়গায় সোজাসুজি শুয়ে থাকতেন আর নবী (ﷺ) চাটাইয়ের উপরে সলাত আদায় করতেন। এমনকি তিনি যখন সিজদায় যেতেন তার কাপড়ের কিছু অংশ তার ঋতুবতী স্ত্রীর গায়ে লাগতো কিন্তু তিনি এতে কিছুই মনে করতেন না।
 
حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ مُدْرِكٍ، قَالَ حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ حَمَّادٍ، قَالَ أَخْبَرَنَا أَبُو عَوَانَةَ ـ اسْمُهُ الْوَضَّاحُ ـ مِنْ كِتَابِهِ قَالَ أَخْبَرَنَا سُلَيْمَانُ الشَّيْبَانِيُّ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ شَدَّادٍ، قَالَ سَمِعْتُ خَالَتِي، مَيْمُونَةَ ـ زَوْجَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهَا كَانَتْ تَكُونُ حَائِضًا لاَ تُصَلِّي، وَهْىَ مُفْتَرِشَةٌ بِحِذَاءِ مَسْجِدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهْوَ يُصَلِّي عَلَى خُمْرَتِهِ، إِذَا سَجَدَ أَصَابَنِي بَعْضُ ثَوْبِهِ‏
হাসান ইবন মুদরিক (র)......আবদুল্লাহ ইবন শাদ্দাত (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আমার খালা নবী (সঃ) এর পত্নী মায়মূনা (রা) থেকে শুনেছি যে, তিনি হায়য অবস্থায় সালাত আদায় করতেন না; তখন তিনি রাসূলুল্লাহ () এর সিজদার যায়গায় সুজাসুজি শুয়ে থাকতেন। নবী () তাঁর চাটাইয়ে সালাত আদায় করতেন। সিজদা করার সময় তাঁর কাপড়ের অংশ আমার গায়ে লাগতো।
[মুসলিম, আবুল হোসাইন ইবনুল হাজ্জাজ, অধ্যায়ঃ (৩), হায়েজ সম্পর্কিত বর্ণনা, ২/৫৯৭,৫৯৮; আহমাদ ইবনু হাম্বল, মুসনাদে আহমদ, অধ্যায়ঃ হায়য-ইস্তিহাযা ও নিফাস, পরিচ্ছেদঃ (৬), ঋতুবতী মহিলার কাপর চোপড় পবিত্র ........., ১/৩২৯।]
 
আবার অপর হাদীস থেকে দেখা যায় যে রাসূল (ﷺ) ঋতুবতী স্ত্রীদের কোলে মাথা রেখে কোরআন তিলাওয়াত করতেন কিন্তু এতে কোন সমস্যা বোধ করতেন না।
 
حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ الْفَضْلُ بْنُ دُكَيْنٍ، سَمِعَ زُهَيْرًا، عَنْ مَنْصُورٍ ابْنِ صَفِيَّةَ، أَنَّ أُمَّهُ، حَدَّثَتْهُ أَنَّ عَائِشَةَ حَدَّثَتْهَا أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَتَّكِئُ فِي حَجْرِي وَأَنَا حَائِضٌ، ثُمَّ يَقْرَأُ الْقُرْآنَ‏ 
আয়িশা (রাযি) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি নবী () আমার কোলে হেলান দিয়ে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। আর তখন আমি হায়েযের অবস্থায় ছিলাম।
[বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহিহ, অধ্যায়ঃ হায়য,পরিচ্ছেদঃ (২০৫), স্ত্রীর হায়য অবস্থায় তার কোলে মাথা রেখে ............ , ১/২৯৩; মুসলিম, আবুল হোসাইন ইবনুল হাজ্জাজ, আস-সহীহ, অধ্যায়ঃ (৩), হায়েজ সম্পর্কিত বর্ণনা, ২/৬০০; আহমাদ ইবনু হাম্বল, মুসনাদে আহমদ, অধ্যায়ঃ হায়য-ইস্তিহাযা ও নিফাস, পরিচ্ছেদঃ (৫), ঝতুবতী মহিলার কোলে কুরআন তিলাওয়াত করা ......... , ১/৩২৭-৩২৮, ইবনু মাজাহ, মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযিদ, আস-সুনান, ১/৬৩৪, আবু দাউদ, সুলাইমান ইবনু আশয়াস, আস-সুনান, ১/২৬০, নাসাঈ, আহমাদ ইবনু শুয়াইব, আস-সুনান, ১/২৭৪ ।]

এবার আপনিই বলুন, আমাদের সৃষ্টিকর্তার একমাত্র মনোনিত জীবনব্যবস্থা ইসলাম কোথায় ঋতুবতী নারীদেরকে অবজ্ঞা করলো? কোথায় তাকে অশুচি বলল? কোথায় ঋতুবতী অবস্থাকে দানবিক মনে করল? কোথায় তাদের কে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট মনে করলো। 
 
আর ইসলাম কি শুধু নারীদেরকে তাদের পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে অপবিত্র ঘোষণা করেছে? নাকি সেই সাথে ক্ষেত্র বিশেষে ইসলাম পুরুষদেরকেও অপবিত্র ঘোষণা করেছে।?
 
ইসলাম যেমন ঋতুকালীন সময়ে নারীদেরকে অপবিত্র বলেছে, ঠিক তেমনি পুষদেরকেও তাদের বীর্যপাতের পর ইসলাম অপবিত্র ঘোষণা করেছে। রাসূল (ﷺ) বলেন,
 
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الصَّبَّاحِ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ، عَنْ عَمْرِو بْنِ دِينَارٍ، عَنِ ابْنِ السَّائِبِ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ سُعَادٍ، عَنْ أَبِي أَيُّوبَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ‏ "‏ الْمَاءُ مِنَ الْمَاءِ
আবূ আইউব……থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: বীর্যপাত হলে গোসল ওয়াজিব হয়। 
[ইবনু মাজাহ, মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযিদ, আস-সুনান, অধ্যায়ঃ পবিত্রতা ও তার পন্থাসমূহ, ১/৬০৭, , আলবানী, মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন, সহীহ আত-তিরমিযী, ১/১১০।]

একবার নিরপেক্ষ মন নিয়ে আপনি ভাবুন, সেই সাথে উপর্যুক্ত দলিলগুলোকে লক্ষ্য করুন। তারপর আপনিই বলুন যে আমাদের ধর্ম ইসলাম একজন ঋতুবতী নারীকে কতটা সম্মানের আসনে বসিয়েছে। ইসলাম তাদের এই সময়ে শারীরিক ও মানসিক কষ্টের কথা বিবেচনা করে সালাতের মত ফরয ইবাদতকেও মাফ করে দিয়েছে।
 
حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، قَالَ حَدَّثَنَا هَمَّامٌ، قَالَ حَدَّثَنَا قَتَادَةُ، قَالَ حَدَّثَتْنِي مُعَاذَةُ، أَنَّ امْرَأَةً، قَالَتْ لِعَائِشَةَ أَتَجْزِي إِحْدَانَا صَلاَتَهَا إِذَا طَهُرَتْ فَقَالَتْ أَحَرُورِيَّةٌ أَنْتِ كُنَّا نَحِيضُ مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَلاَ يَأْمُرُنَا بِهِ‏.‏ أَوْ قَالَتْ فَلاَ نَفْعَلُهُ‏
মূসা ইবন ইসমাঈল (র)......মুআযা (র) থেকে বর্ণিত, এক মহিলা আয়িশা (রা)কে বললেনঃ আমাদের জন্য হায়যকালীন কাযা সালাত পবিত্র হওয়ার পর আদায় করলে চলবে কি না? ‘আয়িশা (রা) বললেনঃ তুমি কি হারুরিইয়্যা? আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সময়ে ঋতুবতী হতাম কিন্তু আমাদের সালাত কাযার নির্দেশ দিতেন না। অথবা তিনি [আয়িশা (রা)] বলেনঃ আমরা তা কাযা করতাম না।
[বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহিহ, অধ্যায়ঃ হায়য,পরিচ্ছেদঃ (২২২), হায়যকালীন সালাতে কাযা নেই, ১/৩১৫]
 
এই আলোচনা থেকে সুস্পষ্টরূপে বোঝা যাচ্ছে যে, ঋতুবতী নারীরা ইসলামে দূষিত কিংবা অপয়া নয়, করুণার পাত্র নয় বরং সম্মানের পাত্র। আর ইসলামে কেবল ঋতুবতী নারীরা অপবিত্র নয় বরং বীর্যপাতের পর পুরুষেরাও অপবিত্র। ঋতুবতী নারীরা যেমন ঋতুবস্থায় কোরআন কারীম স্পর্শ করতে পারে না, ঠিক তেমনি বীর্যপাতের পর একজন পুরুষও কোরআন কারীম স্পর্শ করতে পারে না। ক্ষেত্র বিশেষে যেমন একজন পুরুষও অপবিত্র হয় ঠিক তেমনি ক্ষেত্র বিশেষে নারীরাও অপবিত্র হয়। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে এমন কোন অপবিত্রতাকাল নেই যে সে সময়ে তার জন্য সালাত মাফ অর্থাৎ সে সালাত আর আদায় করতে হবে না। অপরদিকে একমাত্র নারীর জন্যই ইসলাম এমন একটি বিধান রেখেছে যে, ঋতুকালীন অপবিত্রতার সময় নারীদের সালাত মাফ। সে সালাত আর পরবর্তীতে আদায়ও করতে হবে না। 
 
সর্বোপরি ইসলাম তাদের অধিকার, তাদের মর্যাদাকে এই ঋতুকালীন সময়েও সুরক্ষিত রেখেছে। নারীদের ঋতুবস্থা দানবিক, অপয়া কিংবা দূষিতকর নয়; বরং কষ্টকর। কোরআন আমাদেরকে বলছে,


وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًى
আর তারা তোমাকে হায়েজ সম্পর্কে প্রশ্ন করে,বল তা কষ্টকর

 (সূরা বাকারাহঃ ২২২ আয়াত)
 
তাই নাস্তিকদের শিক্ষাগুরু ড. আজাদসহ সব নাস্তিকদের উদ্দেশ্যে আমরা বলব – আপনারা ঋতুকালীন সময়ে নারীদের বিধান নিয়ে দলীলবিহীন মিথ্যাচার করেছেন। ইসলামের বিরুদ্ধে সমালোচনা করার পূর্বে ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করুন, ইসলামের সঠিক বিধান জানার চেষ্টা করুন। যদি কোথাও বুঝতে অক্ষম হন তো কোন আলেমের শরণাপন্ন হোন। আর নয়তো ইসলামের বিরুদ্ধে আপনাদের এই মিথ্যাচার বন্ধ করুন। কেবলমাত্র বাংলা কিংবা চারুকলায় পড়ে, আর নিজেকে বিজ্ঞানমনষ্ক দাবি করে ইসলামের নূন্যতম জ্ঞানার্জন না করেও ইসলামের বিরুদ্ধে কলম ধরাটা কোন বিবেকবান লোকের কাজ নয়।
 
বস্তুত একমাত্র মহান আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।