নবী(ﷺ) কি শত্রুর কাটা মাথা দেখে খুশী হতেন?

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব নৈতিকতা বিষয়ক



 

নাস্তিক-মুক্তমনারা তাদের একটি ওয়েবসাইটে ও ফেসবুক লাইভে দাবি করেছে— নবী(ﷺ) নাকি তাঁর শত্রুর কাটা মাথা দেখে খুশী হতেন। নবী(ﷺ)কে একজন নিষ্ঠুর ও খারাপ মানুষ হিসাবে চিত্রিত করবার প্রয়াস থেকে তাদের এই প্রচারণা।

 

প্রথমতঃ

ইসলামের কোনো আকিদা প্রমাণ করতে হলে এর স্বপক্ষে বিশুদ্ধ বিবরণ প্রয়োজন। “নবী(ﷺ) শত্রুর কাটা মাথা দেখে খুশী হতেন” এটি উল্লেখ করে তা থেকে কিছু প্রমাণ করতে হলে এ সম্পর্কিত বর্ণনাটি সহীহ হতে হবে।

 

দ্বিতীয়তঃ

কা’ব বিন আশরাফকে হত্যা করবার বিষয়টি বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত। বহুবিধ অপরাধের প্রেক্ষিতে কা’ব বিন আশরাফকে মদীনা রাষ্ট্রের প্রধান মুহাম্মাদ(ﷺ) মৃত্যুদণ্ড দেন। কিন্তু তার মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে বিশুদ্ধ বর্ণনার মধ্যে কোথাও তার মাথা কেটে রাসুল(ﷺ) এর সামনে হাজির করা বা তা দেখে রাসুল(ﷺ) এর খুশী হবার উল্লেখ নেই। সুনান আবু দাউদে এ সংক্রান্ত একটি বিশুদ্ধ বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু সেখানে মাথা কাটার কোনো উল্লেখ নেই। [1] বিশুদ্ধ বর্ণনার সমন্বয়ে রচিত সিরাত গ্রন্থ ‘সহীহুস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ’তে আলোচ্য ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ থাকলেও কা’বের মাথা কাটবার কোনো উল্লেখ নেই। [2]  এমনকি ‘ইবন হিশামে’র বিস্তারিত বর্ণনাতেও কা’বের মাথা কেটে নিয়ে যাবার কোনো উল্লেখ নেই। [3]

তাছাড়া বিস্তারিত বর্ণনায় সেই ঝুঁকিপূর্ণ অভিজানের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে তার মাথা কেটে তা অনেক দূরে বয়ে নিয়ে যাবার ব্যাপারটিকে অসম্ভব পর্যায়ের বলেই মনে হয়।  

 

তৃতীয়তঃ

তবে ইবন সা’দ(র.) এর ‘তাবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থে একটি বর্ণনা এসেছে যেখানে বলা হয়েছে – সাহাবীরা কা’ব বিন আশরাফের কর্তিত মাথা রাসুল(ﷺ) এর নিকট আনলে তিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন।

 

وَفِي رِوَايَةِ بن سَعْدٍ فَلَمَّا بَلَغُوا بَقِيعَ الْغَرْقَدِ كَبَّرُوا وَقَدْ قَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تِلْكَ اللَّيْلَةَ يُصَلِّي فَلَمَّا سَمِعَ تَكْبِيرَهُمْ كَبَّرَ وَعَرَفَ أَنْ قَدْ قَتَلُوهُ ثُمَّ انْتَهَوْا إِلَيْهِ فَقَالَ أَفْلَحَتِ الْوُجُوهُ فَقَالُوا وَوَجْهُكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَرَمُوا رَأْسَهُ بَيْنَ يَدَيْهِ فَحَمِدَ اللَّهَ عَلَى قَتْلِهِ

অর্থঃ ‘ইবনে সাদের বর্ণনায় এসেছে, সাহাবায়ে কিরাম (ইসলামের দুশমন পাপিষ্ঠ কাব বিন আশরাফকে হত্যা করে) যখন বাকিউল গারকাদে পৌঁছলেন, তখন সবাই “আল্লাহু আকবার” বলে ধ্বনি দিলেন। রাসুলুল্লাহ() সে রাতে নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি যখন তাঁদের তাকবির-ধ্বনি শুনতে পেলেন, তিনিও তাকবির-ধ্বনি দিলেন এবং বুঝতে পারলেন যে, তাঁরা তাকে হত্যা করে ফেলেছে। অতঃপর সাহাবায়ে কিরাম তাঁর নিকট পৌঁছলে তিনি বললেন, সফল হোক (তোমাদের) চেহারাগুলো। তাঁরা প্রতিউত্তরে বললেন, এবং আপনার চেহারাও (সফল হোক), হে আল্লাহর রাসুল। তাঁরা তার (কর্তিত) মাথা তাঁর সামনে ফেললে তিনি তার নিহত হওয়ায় আল্লাহর প্রশংসা করলেন।[4]

 

ইবন সা’দ(র.) এর ‘তাবাকাত’ এর বর্ণনা থেকে ইবন হাজার আসকালানী(র.) তাঁর ‘ফাতহুল বারী’তে এটি উল্লেখ করেছেন। সেখান থেকে ‘রাহিকুল মাখতুম’সহ অন্য কিছু সিরাত গ্রন্থেও এটি উদ্ধৃত হয়েছে। তবে এখানে মূল উৎস হচ্ছে ইবন সা’দ(র.) এর বর্ণনা।

 

এই বর্ণনাটি কতোটুকু বিশুদ্ধ?

এই বর্ণনাটির সনদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি একটি মুরসাল বর্ণনা। কাজেই এটি যঈফ (দুর্বল)। এটি কোনো বিশুদ্ধ বর্ণনা নয়[5]

 

 

অতএব এই বর্ণনাটি দেখিয়ে মোটেও এটি প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে সাহাবীরা কা’ব বিন আশরাফের কাটা মাথা রাসুল(ﷺ) এর সামনে হাজির করেছিলেন। যদিও কয়েকটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থে বর্ণনাটি আছে, কিন্তু এটি বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়।

 

আরো একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, এই বর্ণনায় রাসুল(ﷺ) আল্লাহর প্রশংসা করেছেন একজন ইসলামের শত্রুর পতনের জন্য। এটি বলা হয়নি যে তিনি শত্রুর মাথা কাটার জন্য খুশী হয়েছেন। বর্ণনায় স্পষ্টভাবে এটি উল্লেখ আছেঃ “...তিনি তার নিহত হওয়ায় আল্লাহর প্রশংসা করলেন”।

 

চতুর্থতঃ

যুদ্ধের ময়দানেও শত্রুর লাশ বিকৃত করতে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) নিষেধ করতেন। এ ব্যাপারে বিশুদ্ধ বর্ণনা রয়েছে।

 

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: اغْزُوا بِاسْمِ اللهِ، وَفِي سَبِيلِ اللهِ، وَقَاتِلُوا مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ، اغْزُوا وَلاَ تَغْدِرُوا، وَلاَ تَغُلُّوا، وَلاَ تُمَثِّلُوا، وَلاَ تَقْتُلُوا وَلِيدًا صحيح

অর্থঃ “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো। যারা আল্লাহর সাথে কুফরী করেছে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। তোমরা যুদ্ধ করে যাও কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করো না, ওয়াদা ভঙ্গ করো না, গানীমাতের মাল আত্মসাৎ করো না, লাশ বিকৃত করো না এবং শিশুদের হত্যা করো না। [6]

 

 

উপসংহারে আমরা বলতে পারি, “শত্রুর কাটা মাথা দেখে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) খুশী হতেন” — নাস্তিক-মুক্তমনাদের এই দাবির স্বপক্ষে কোনো বিশুদ্ধ বিবরণ নেই। বরং বিশুদ্ধ বিবরণ থেকে এটিই প্রমাণিত যে, নবীজি(ﷺ) যুদ্ধের ময়দানেও শত্রুর লাশ বিকৃত করতে নিষেধ করতেন।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং : ৩০০০ (সহীহ)

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=60368

[2] সীরাতুন নবি [‘সহীহুস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ’ এর বাংলা অনুবাদ] – ইব্রাহিম আলি (মাকতাবাতুল বায়ান প্রকাশনী), খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৪৬-১৪৯

[3] সীরাতুন নবী (সা.) - ইবন হিশাম, ৩য় খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), পৃষ্ঠা ৩১-৩৫

[4] তাবাকাতুল কুবরা – ইবন সা’দ ২/৩৪; ফাতহুল বারী – ইবন হাজার আসকালানী: ৭/৩৪০

[5] لكتاب: حياة الصحابة

المؤلف: محمد يوسف بن محمد إلياس بن محمد إسماعيل الكاندهلوي (المتوفى: 1384هـ)

حققه، وضبط نصه، وعلق عليه: الدكتور بشار عوّاد معروف

পৃষ্ঠা ৪৬৪

https://is.gd/1zEbyc

[6] সুনান আবু দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিস নং : ২৬১৩ (সহীহ)

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=59981