বজ্র কি আসলেই ফেরেশতার আগুনের চাবুক এবং গর্জনের ফলে তৈরি হয়?

বৈজ্ঞানিক অসামাঞ্জস্য বিষয়ক অভিযোগের জবাব



 

মূলঃ Islamweb

অনুবাদঃ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার

 

ফতোয়া নং : ৩৩৫৯২৩ [একটি হাদিস, যেখানে বজ্রকে ফেরেশতা বলা হয়েছে]

 

প্রশ্নঃ  

“ইহুদিরা নবী(ﷺ)-এর নিকট এসে বললো, হে আবুল কাসিম! আমাদেরকে রা’দ (মেঘের গর্জন / বজ্র) প্রসঙ্গে বলুন। এটা কী? তিনি বললেনঃ মেঘমালাকে হাকিয়ে নেয়ার জন্য ফেরেশতাদের একজন নিয়োজিত আছে। তার সাথে রয়েছে আগুনের চাবুক। এর সাহায্যে সে মেঘমালাকে সেদিকে পরিচালনা করেন, যেদিকে আল্লাহ চান। …” (তিরমিযি ৩১১৭)

এই হাদিসটি কি সহীহ? আর এর ব্যাখ্যাও বা কী?

 

উত্তরঃ

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর, যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং এবং মুহাম্মাদ(ﷺ) তাঁর বান্দা ও রাসুল।

 

এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ(র.), তিরমিযি(র.) এবং আরো কেউ কেউ। কারো কারো মতে হাদিসটি সহীহ (বিশুদ্ধ)। যেমনটি বলেছেন ইবন মানদাহ(র.), ‘কিতাবুত তাওহিদ’-এ। এছাড়া আহমাদ শাকির এবং আলবানী (র.)ও এই হাদিসকে সহীহ বলেছেন। ‘দুররে মানসুর’ গ্রন্থে সুয়ুতী(র.) বলেছেন, “ইমাম তিরমিযি(র.) একে সহীহ এর ভেতর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তবে আমাদের নিকট যেসব কিতাব আছে, সেগুলো অনুযায়ী তিনি বলেছেন, “এটি হাসান গরীব”।”

 

অবশ্য কোনো কোনো আলেম এই হাদিসকে যঈফ (দুর্বল) বলে অভিহীত করেছেন। যেমন শাওকানী(র.) তাঁর তাফসিরের মধ্যে বলেছেন, “এর বর্ণনাক্রম দুর্বল”।

শুআইব আরনাউত এবং  সমকালীন কিছু আলিমও এই হাদিসকে দুর্বল বলেছেন। তিনি [শুআইব আরনাউত] তাঁর মুসনাদ আহমাদের ব্যাখ্যার মধ্যে এ হাদিসকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন। এ ব্যাপারে তাঁদের বক্তব্য ইন্টারনেটে পাওয়া যায়।

 

এই হাদিসের ব্যাখ্যায়  ‘তানওয়ির শারহুল জামি’ আস সগির’ গ্রন্থে সানআনী(র.) বলেছেন, রা’দ (যার শাব্দিক অর্থ ‘বজ্র’) হচ্ছেন আল্লাহর একজন ফেরেশতা যাকে মেঘমালার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা হয়। যাঁর রয়েছে বাঁকানো আগুনের ফালি যা দিয়ে তিনি মেঘমালাকে হাঁকিয়ে নেন, যেদিকে আল্লাহ চান। [সংক্ষেপিত]

 

এ হাদিসের ব্যাপারে বহুল প্রচলিত কিছু অভিযোগ রয়েছে। যারা মনে করেন এই হাদিসে অসঙ্গতি রয়েছে, তাদের উদ্যেশ্যে বলবঃ যদি আমরা ধরে নিই যে হাদিসটি বিশুদ্ধ, সেই সাথে বজ্র তৈরি হবার বৈজ্ঞানিক কার্যকারণকেও মাথায় রাখি, তবুও এটা বলতে হবে যে এর অধিবিদ্যামূলক (Metaphysical) কারণগুলো আমাদের নিকট সুনিশ্চিত। যেমন, জাগতিক বিভিন্ন ঘটনার কারণের সাথে ফেরেশতাদের বিভিন্ন কার্যকলাপ সাংঘর্ষিক নয়। উভয়েই আল্লাহ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ও নির্ধারিত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মৃত্যুর ফেরেশতা কর্তৃক আত্মা নিয়ে নেবার দরুণ সবাই মারা যায়। কিন্তু এটি একজন ব্যক্তির মৃত্যুর জাগতিক বিভিন্ন কারণের সাথে সাংঘর্ষিক নয় যেমনঃ হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া, কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া কিংবা অন্য কোনো কারণ।

 

ইবন তাইমিয়া(র.) বলেছেন, “মেঘের গর্জন ও বিজলী চমকানোর ব্যাপারে – ইমাম তিরমিযি(র.) এবং অন্যান্যদের বর্ণনাকৃত হাদিসটিতে নবী(ﷺ)কে রা’দ (বজ্র) এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয় এবং তিনি উত্তর দেন যে, রা’দ হচ্ছেন আল্লাহর একজন ফেরেশতা যাকে মেঘমালার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা হয়। যাঁর রয়েছে বাঁকানো আগুনের ফালি যা দিয়ে তিনি মেঘমালাকে হাঁকিয়ে নেন, যেদিকে আল্লাহ চান। আল খারা’ইতির ‘মাকারিমুল আখলাক’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, আলী(রা.)কে রা’দ (বজ্র) এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দেন, “এটি একজন ফেরেশতা”। তাঁকে বিজলী চমকানোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দেন, “এটি ফেরেশতাদের হাতের বাঁকানো অগ্নিশিখা।” একটি বর্ণনা অনুযায়ী, “এটি ফেরেশতাদের হাতের বাঁকানো লোহা।” এ ব্যাপারে আরো বর্ণনা রয়েছে।

 

সালাফদের যুগের আলিমদের থেকে আরো বক্তব্য পাওয়া যায়, যা উপরের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। যেমন এরূপ একটি বক্তব্যঃ “...এটি হচ্ছে বায়ুচাপের ফলে আকাশের মেঘের সঞ্চালন। তবে এটি তো এর (জাগতিক ব্যাখ্যা) সাথে সাংঘর্ষিক নয় ... ফেরেশতারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মেঘকে চালনা করেন। নিশ্চয়ই উপরের ও নিচের জগতের প্রতিটি নড়াচড়াই ফেরেশতাদের কর্মোদ্যোগের ফলে হয়।

 

একজন ব্যক্তির কণ্ঠনিঃসৃত ধ্বনি তৈরি হয় তার দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়ার দ্বারা। সেগুলো হচ্ছে তার ঠোঁট, জিহ্বা, দাঁত, আলজিভ এবং গলা। [যদিও শুধুমাত্র ঐ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো দ্বারা ধ্বনি সৃষ্টি হচ্ছে] এরপরেও বলা হয় যে সম্পূর্ণ ব্যক্তিটিই তার প্রতিপালকের প্রশংসা করছে, সৎকাজের আদেশ দিচ্ছে ও অসৎকাজে নিষেধ করছে। {এখানে ব্যক্তিটির ঐ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো কথা বলছে কিংবা সম্পূর্ণ ব্যক্তিটি কথা বলছে – উভয় উক্তিই সত্য। উক্তিগুলো পরস্পর সাংঘর্ষিক নয়। }

[ইবন তাইমিয়ার বক্তব্য সমাপ্ত]

 

আল্লাহই উত্তম জানেন।

 

মূল ফতোয়ার লিঙ্কঃ https://www.islamweb.net/en/fatwa/335923/