Pray for the world economy

হাসান(রা.) কি অনেক বেশি বিয়ে করতেন ও তালাক দিতেন?

 

একজন প্রবাসী নাস্তিক পরিচালিত ব্লগে নবী() এর সম্মানিত দৌহিত্র হাসান(রা.) এর ব্যাপারে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ বিশেষণ দিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে তিনি নাকি “বিলাসবহুল রঙ্গিন জীবন” যাপন করতেন (নাউযুবিল্লাহ)। এর প্রমাণ হিসেবে সেখানে ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থ থেকে কিছু বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়েছে যেখানে উল্লেখ আছে হাসান(রা.) অনেক সংখ্যক বিবাহ করেছেন ও তালাক দিয়েছেন।

 

তাদের উল্লেখিত এ সংক্রান্ত একটি বর্ণনা হচ্ছে,

 

ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন যে, হযরত হাসান (বা) বহু বিবাহকারী লোক ছিলেন ৷ সবসময় চারজন স্বাধীন মহিলা তার স্ত্রী হিসেবে থাকতেনই ৷ তিনি বহু স্ত্রীকে তালাক প্রদান করেছেন ৷ কথিত আছে যে, তিনি সর্বমোট ৭০ জন মহিলাকে বিবাহ করেছিলেন ৷ তারা আরো বলেছেন যে, একদিন তিনি তার দু ’জন স্ত্রীকে তালাক প্রদান করেছিলেন৷ একজন ছিল বানূ আসাদ গোত্রের অন্যজন বানূ ফাযারা গোত্রের৷ তারপর তিনি ওদের প্রত্যেককে ১০ হাজার দিরহাম ও কয়েক বোতল মধু প্রদান করেছিলেন৷ তিনি তার সেবককে বলেছিলেন, ওরা কি মন্তব্য করে তা তুমি মনোযোগ দিয়ে শুনবে ৷ বস্তুত বানূ ফাযাৱা গোত্রের মহিলাটি উপহার পেয়ে বলেছিল, আল্লাহ্ তা জানা হযরত হাসান (রা) কে উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন৷’ সে হযরত হাসান(রা) এর জন্যে আরো দুআ ও কল্যাণ কামনা করেছিল৷ অন্যদিকে বানূ আসাদ গোত্রের মহিলাটি বলেছিল, “একজন ভালবাসার মানুষের সাথে বিচ্ছেদের মোকাবেলায় নিতাস্তই তুচ্ছ।”তার সেবক ফিরে এসে উভয়ের বত্তল্য জানাল৷ পরবর্তীতে হযরত হাসান (রা) বানু আসাদ গোত্রের মহিলাটিকে দাম্পত্য জীবনে ফিরিয়ে নিলেন এবং বানূ ফাযারা গোত্রের মহিলাটিকে ত্যাগ করলেন ৷ হযরত আলী (রা) কুফার অধিবাসী লোকদেরকে বলতেন, তোমাদের মহিলাদেরকে হযরত হাসান (রা) এর নিকট বিয়ে দিও না ৷ কারণ সে একজন অতিশয় তালাক দানকারী পুরুষ ৷’ উত্তরে তারা বলত, আমীরুল মুমিনীন ! আল্লাহর কসম! হযরত হাসান (রা) যদি প্রতিদিন আমাদের মহিলাদেরকে বিয়ে করতে চাইতেন তবে তাদের সকলকে আমরা তার নিকট বিয়ে দিয়ে দিব আর তা শুধু এই উদ্দেশ্যে যে, রাসুলুল্লাহ (সা) এর পরিবারের সাথে যেন আমরা বিবাহ সূত্রে আত্মীয় হতে পারি ৷[1]

 

তাদের উল্লেখিত আরেকটি বর্ণনাঃ

 

আবু জাফর (র) বলেছেন যে, হযরত আলী (রা) বলেছেন, হে কুফার অধিৰাসীবৃন্দ! তোমরা তোমাদের কোন মহিলাকে হাসান (রা) এর নিকট বিয়ে দিও না ৷ কারণ সে অধিকহারে স্ত্রীদেকে তালাক দেয় ৷’ তখন হামাযান গোত্রের এক লোক বলল, আল্লাহর কসম ! আমরা অবশ্যই তার নিকট আমাদের মেয়েদেরকে বিয়ে দিব ৷ তারপর যাকে তার রাখতে মন চায়,- রাখবেন আর যাকে ইচ্ছা তালাক দিবেন’ ৷[2]

 

প্রথমতঃ

আমরা দেখতে পাচ্ছি এই বর্ণনাগুলোতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে বিভিন্ন আরব গোত্রগুলো নিজেরাই নবী() এর পরিবারের সাথে আত্মীয়তা করার আগ্রহে হাসান(রা.) এর সাথে নিজ কন্যাদের বিবাহ দিতে চাইতো। হাসান(রা.) নিজে “রঙিন জীবনের” তাড়নায় এই বিবাহগুলো করেছেন (যেমনটি ইসলামের শত্রুরা দাবি করে থাকে) বিষয়টি মোটেও এমন না। 

 

দ্বিতীয়তঃ

বিভিন্ন ইতিহাস ও জীবনী গ্রন্থের বর্ণনাগুলো সম্পর্কে উলামাগণ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন যা আমাদের পাঠকদের জানা বিশেষভাবে জরুরী মনে করছি। হাফিজ ইরাকী(র.) বলেছেন,

 

وليعلمِ الطالبُ أنَّ السّيَرَا * تَجمَعُ ما صحَّ وما قدْ أُنْكرَا

অর্থঃ “শিক্ষার্থীদের এটি জানা উচিত যে জীবনী গ্রন্থগুলোতে আমরা এমন বর্ণনা পেতে পারি যেগুলো বিশুদ্ধ আবার এমন বর্ণনা পেতে পারি যেগুলো পরিত্যাজ্য।[3]

 

শায়খ আব্দুর রহমান মু’আল্লিমি(র.) বলেছেন,

 

على أنّ حاجة التاريخ إلى معرفة أحوال ناقلي الوقائع التاريخية أشدّ من حاجة الحديث إلى ذلك، فإنّ الكذب والتساهل في التاريخ أكثر،

অর্থঃ “হাদিস শাস্ত্রের চেয়ে তারিখ (ইতিহাস) শাস্ত্রে বর্ণনাকারীর অবস্থা জানা অনেক বেশি জরুরী। কেননা ঐতিহাসিক বর্ণনার ক্ষেত্রে মিথ্যা ও ছাড় দেয়ার ব্যাপারগুলো অনেক বেশি ঘটে থাকে।[4]

 

তৃতীয়তঃ

আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’র এই বর্ণনাগুলোর সনদের ব্যাপারে শায়খ মুহাম্মাদ সালিহ আল মুনাজ্জিদ(হাফি.) পরিচালিত ফতোয়ার ওয়েবসাইট Islam QAতে উল্লেখ করা হয়েছে,

 

হাসান(রা.) ৭০ এর অধিক নারীকে অথবা ৯০ জনকে বিয়ে করেছেন অথবা সমজাতীয় বর্ণনাগুলোর ব্যাপারে আমরা কোনো শক্তিশালী সনদ খুঁজে পাইনি যা দ্বারা এই বর্ণনাগুলো প্রমাণ হতে পারে। কাজেই আমাদের এই বর্ণনাগুলো (বিশুদ্ধ হিসেবে) গ্রহণ করা থেকে বিরত হওয়া উচিত এবং হুট করে এগুলোর উপর নির্ভর করে ফেলা উচিত নয়।

 

সেখানে আরো বলা হয়েছে,

 

সম্ভবত হাফিজ ইবন কাসির(র.) নিজেই ইঙ্গিত করেছেন যে এই বিষয়ে যে বর্ণনাগুলো আছে সেগুলো বিশুদ্ধ নয়। তিনি বলেছেনঃ কথিত আছে যে, তিনি সর্বমোট ৭০ জন মহিলাকে বিবাহ করেছিলেন ৷  তিনি এই বিষয়টি ইঙ্গিত করেছেন “কথিত আছে” বলার দ্বারা যারা দ্বারা বোঝা যায় এই বর্ণনাটি বিশুদ্ধ বলে প্রমাণিত নয়। এই কথার দ্বারা কমপক্ষে এটি বোঝা যায় যে তিনি এই বর্ণনার কোনো নির্ভরযোগ্য সনদ খুঁজে পাননি।[5]

 

আমরা দেখলাম এই জাতীয় বর্ণনাগুলোর কোনো বিশুদ্ধ সনদ নেই। এমনকি স্বয়ং ইবন কাসির(র.) থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে এই বর্ণনাগুলো সহীহ সনদের দ্বারা প্রমাণিত নয়।

 

চতুর্থতঃ

বর্তমান সময়ে ইসলামী ইতিহাস শাস্ত্রে অন্যতম পণ্ডিত ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি (হাফি.) তাঁর ‘হাসান ইবনু আলি রা. - জীবন ও কর্ম’ গ্রন্থে এই জাতীয় যতো বর্ণনা আছে সবগুলো একত্রে সন্নিবেশ করেছেন এবং সেগুলোর তাহকিকও উল্লেখ করেছেন। তিনি সেখানে দেখিয়েছেন যে হাদিসশাস্ত্রের নীতিমালা অনুসারে এই জাতীয় বর্ণনার মাঝে একটিও বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়।

 

পাঠকদের জন্য এর কিয়দাংশ উল্লেখ করছি—

 

“ … তার বিয়ের সংখ্যা সম্পর্কে সমাজে অনেক বানোয়াট বর্ণনা রয়েছে। যেমনঃ তিনি ৭০টি বিয়ে করেছেন, কেউ বলে ৯০টি বিয়ে করেছেন, কারও মতে ২৫০টি বিয়ে করেছেন, আবার কেউ আরও  বাড়িয়ে বলে তিনি ৩০০টি বিয়ে করেছেন। এগুলো ভিত্তিহীন অসার বক্তব্য, বাস্তবতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।

 

১. প্রথম বর্ণনা : ইবনু আবিল হাদিদ প্রমুখ এটি উল্লেখ করেছেন; আরআলি ইবনু আবদিল্লাহর সুত্রে তারা বর্ণনাটি পেয়েছেন। [6]তিনি ২২৫ হিজরিতে ইনতিকাল করেন। তিনি একজননিতান্ত দুর্বল বর্ণনাকারী। হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে তার ওপর আস্থা রাখা হয় না। সহিহ মুসলিমে ইমাম মুসলিম রাহ. তাঁর সূত্রে বর্ণিত হাদিস উল্লেখ করেননি। [7]আল-কামিল গ্রন্থে ইবনু আদি রাহ. তাকে জয়িফ তথা দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন। তিনি তার ব্যাপারে বলেন, হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি শক্তিশালী নন। ঘটনা সম্পর্কীয় কিছু হাদিস তিনি বর্ণনা করেছেন; তবে তার বর্ণিত মুসনাদ হাদিসের সংখ্যা খুবই কম। [8]

 

২. দ্বিতীয় বর্ণনাটি হলো মুরসাল : আর মুরসাল হাদিস জয়িফের অন্তর্ভুক্ত।

 

৩. তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ণনা : আবু তালিব আল মাক্কি তার কুতুল কুলুব গ্রন্থে এটা উল্লেখ করেছেন। আবু তালিব মাক্কি দুর্বল লেখক। তার ওপর আস্থা রাখা যায় না। আমিরুল মুমিনিন হাসানের(রা.) অধিক বিয়েসংক্রান্ত হাদিসগুলো তার থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে। আবু তালিব মাক্কি দুনিয়াবিরাগী একজন বক্তা ছিলেন। কুতুল কুলুব গ্রন্থে অনেক মুনকার ও অপ্রমাণিত হাদিস উল্লেখ করেছেন। [9]বেশ কিছু অপ্রমাণিত হাদিস তিনি তার বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।[10] তার রচিত কুতুল কুলুব গ্রন্থে উল্লেখ আছে, হাসান রা. ২৫০টি বিয়ে করেছেন। কারও মতে ৩০০টি বিয়ে করেছেন। এ জন্য আলি রা. তাকে ধমক দিতেন এবং লজ্জিত হতেন। কারণ, হাসান রা. তাদের তালাক দেওয়ার পর আলি রা. তাদের পরিবারের সামনে যেতে লজ্জাবোধ করতেন। আলি রা. মহিলাদের বলতেন, ‘হাসান উদ্ভ্রান্ত ছেলে, তোমরা তাকে বিয়ে করো না। হামাদান গোত্রের এক ব্যক্তি তখন আলি রা.-কে বলেন, ‘আমিরুল মুমিনিন, আমরা ইচ্ছামতো তাকে বিয়ে করাব। যাকে ইচ্ছা তিনি স্ত্রী হিসেবে রেখে দেবেন আর যাকে ইচ্ছা তাকে তালাক দিয়ে দেবেন।’ এতে আলি রা. আনন্দিত হয়ে আবৃত্তি করেন, “আমি যদি জান্নাতের দরজার দায়িত্বশীল হতাম, হামাদান গোত্রের সবাইকে জান্নাতে দিতাম!”

 

হাসান কখনো চার জন স্ত্রী একসঙ্গে রেখে দিতেন; আবার কখনো চারজনকেই একসঙ্গে তালাক দিয়ে দিতেন।[11]

উল্লিখিত বর্ণনাগুলো সঠিক নয়। এগুলো অপ্রমাণিত ও বানোয়াট বর্ণনা।

 

হাসানের বিয়ে সম্পর্কে সমাজে আরও অনেক কাহিনি বর্ণিত আছে, যার সনদ মারাত্মক দুর্বল ও আপত্তিকর। যেমন :

 

১.

হুজালি রাহ, মুহাম্মাদ ইবনু সিরিনের সূত্রে উল্লেখ করেন, হিন্দ বিনতু সুহাইল ইবন আমর ছিলেন আবদুর রাহমান আত্তাব ইবনু উসাইদের বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ। আবদুর রাহমান ছিলেন তার প্রথম স্বামী। তিনি তালাক দিলে আবদুল্লাহ ইবনু আমির ইবনু কুরাইজ তাকে বিয়ে করেন। তিনিও তালাক দিয়ে দেন। মুআবিয়া রা. আবু হুরায়রাকে পত্র লেখেন, তিনি যেন ইয়াজিদের জন্য ওই মহিলার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন।… … … কিছুদিন পর আবদুল্লাহ ইবনু আমির মদিনায় এসে হাসানকে বলেন, “ওই মহিলার কাছে আমার একটি আমানত আছে।” হাসান তাকে ওই মহিলার কাছে নিয়ে যান। সেই মহিলা আবদুল্লাহ ইবনু আমিরের সামনে এসে বসলে আবদুল্লাহর জন্য তার মন বিগলিত হয়। তখন হাসান রা. আমিরকে বলেন, ‘আমি কি তাকে তালাক দেবো? আমাকে তাহলে তোমরা একজন মুহাল্লিল [12] মনে করতে পারো। আমার চেয়ে তো উত্তম কোনো মুহাল্লিলও পাবে না?' তিনি বলেন, “আমি তো কেবল আমার আমানত নিতে এসেছি।” এরপর সেই মহিলা অলংকার ভরতি দুটি থলে বের করে দেন। আবদুল্লাহ ইবনু আমির তার একটি থলে থেকে কিছু অলংকার নিয়ে বাকিগুলো তাকে ফিরিয়ে দেন। তখন ওই মহিলা বললেন, “তাদের সকলের সরদার হলেন হাসান ও সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তি ইবনু আমির; আর আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি আবদুর রাহমান ইবনু আত্তাব।” [13]

 

এ হাদিসের সনদে হুজালি নামের বর্ণনাকারী আছেন। তিনি ইতিহাসবিদ। পরিত্যাজ্য বর্ণনাকারী। তার বর্ণিত হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম জাহাবি বলেন, সে দুর্বল বর্ণনাকারী হওয়ার ব্যাপারে সকল মুহাদ্দিস একমত।[14]

 

২.

ইসা ইবনু আবি হারুন আল মুজানির সূত্রে সুহাইম ইবনু হাফস আল আনসারি বর্ণনা করেন, হাসান রা. হাফসা বিনতু আবদির রাহমান ইবনু আবি বকরকে বিয়ে করেন। মুনজির ইবনু জুবায়ের তাকে পছন্দ করতেন। হাসান তা জানতে পেরে তাকে তালাক দিয়ে দেন। মুনজির বিয়ের প্রস্তাব দিলে মহিলা প্রত্যাখ্যান করেন। তখন আসিম ইবনু উমর ইবনুল খাত্তাব তাকে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন। মহিলা সম্মত হলে তাদের বিয়ে হয়ে যায়। মুনজির তার কাছেও মহিলার ব্যাপারে নানান কিছু বললে তিনিও তাকে তালাক দিয়ে দেন। মুনজির এবারও মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।

… … …

হাসান রা. তখন আসিম ইবনু উমরকে বলেন, “আমাকে নিয়ে চলুন, মুনজিরের অনুমতি নিয়ে মহিলার কাছে যাব।” মহিলা হাসানের তুলনায় আসিমের দিকে বেশি লক্ষ করছিলেন এবং তার সঙ্গে একটু বেশি কথা বলছিলেন। হাসান রা. তখন মুনজিরকে মহিলার হাত ধরার আদেশ করেন এবং মুনজির তখন মহিলার হাত ধরেন। হাসান রা. এই মহিলাকে অনেক অনেক ভালোবাসতেন; কিন্তু মুনজিরের প্রচণ্ড আগ্রহ দেখে তিনি তাকে তালাক দিয়ে দেন।

 

… … পরবর্তী সময়ে আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ ইবন আবদির রাহমান ইবনু আতিককে হাসান আবার বলেন, “আকিক এলাকায় যাবে?” তখন তিনি হাসানকে বলেন, “এভাবেই বলতে পারেন যে, হাফসার কাছে যাবে?” [15]

 

এটা অবাস্তব ও অপ্রমাণিত একটা বর্ণনা। তার সনদে এমন অনেক বর্ণনাকারী আছেন, জীবনীগ্রন্থসমূহে যাদের জীবনী নিয়ে কোনো আলোচনাই নেই। তার হাদিসের মতনে শরিয়তবিরোধী বিষয় থেকেই প্রমাণিত হয়, এটা কত বানোয়াট ও অপ্রমাণিত বর্ণনা। [16]

 

৩.

হাতিম ইবনু ইসমাইল জাফর ইবনু মুহাম্মাদের সূত্রে, তিনি তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন; আলি রা. বলেন, হাসান এত অধিক পরিমাণে বিয়ে করছিল এবং তালাক প্রদান করছিল যে, আমার ভয় হতে থাকে অনেক বংশের সঙ্গে তার শত্রুতা তৈরি হয়ে যাবে।[17]

উল্লিখিত বর্ণনা মুরসাল ও জয়িফ।

 

 হাসানের বিয়ে সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায়; কিন্তু সনদের বিচারে এগুলো প্রমাণিত নয়। তা ছাড়া এগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেখা এমনিতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এগুলোর ওপর ভরসা করা যাবে না। এর পক্ষে অনেকগুলো প্রমাণ ও কারণ আছে :

 

১.

সত্যই যদি হাসান এত অধিক বিয়ে করতেন, তাহলে তাঁর সন্তান হতো অধিক পরিমাণ; অথচ তার মাত্র ১২ জন সন্তান ছিল। এই সংখ্যা সে যুগ হিসেবে একেবারে স্বাভাবিক। বিয়ের সংখ্যা এত বেশি আর সন্তান এত কম, এটা সামগ্রিকভাবে বিপরীতমুখী আলোচনা।

… …

এসব বিষয়ের কারণেই ইলমুল জারহি ওয়াত দিল এবং বিভিন্ন বর্ণনার ওপর হুকুম আরোপের গুরুত্ব উদ্ভাসিত হয়। হাদিসশাস্ত্রের কিংবদন্তি আলিমগণ সীমাহীন কষ্ট করে এগুলো প্রচার না করলে কত মানুষের সম্মান অকাতরে নষ্ট হয়ে। তা কারণ, সঠিক ও বানোয়াট বর্ণনার মধ্যে তারা পার্থক্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন। উম্মাহর কাছে তারা এমন এক ভাণ্ডার রেখে গিয়েছেন, যার সাহায্যে বানোয়াটের মধ্যে অতি সহজেই পার্থক্য করা যায়। এ জন্য উম্মাহর ইতিহাস-গবেষকদের আবেদন করব, তারা যেন এসব বর্ণনা সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং এগুলো চিহ্নিত করে উম্মাহকে সতর্ক করেন, যাতে উম্মাহ সঠিক বর্ণনা ও দুর্বল বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। এতে উম্মাহর জন্য তাদের অবদান হবে অবিস্মরণীয়। তারা যেন ওই সকল ইতিহাসবিদদের মতো না হন যারা বিভিন্ন দুর্বল ও বানোয়াট বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে এসব অহেতুক বর্ণনা আপন আপন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

 

৩.

 অধিক বিয়ের বর্ণনা বানোয়াট হওয়ার আরেকটি প্রমাণ উল্লেখ করছি। বর্ণিত আছে; হাসানের ইনতিকালের পর প্রচুরসংখ্যক মহিলা খালি পায়ে ও খালি মাথায় রাস্তায় বের হয়ে এসে বলতে থাকে—“আমরা হাসানের স্ত্রী।

 

 এ বর্ণনা বানোয়াট ও জাল হওয়া একেবারে সুস্পষ্ট। কারণ, সে যুগের মুসলিম মহিলারা এভাবে পুরুষদের সামনে খালি মাথায় ও খালি পায়ে বের হয়ে আসা অকল্পনীয়। স্বভাবতই বুঝে আসে, হাসানের বিবিরা হবেন যুগের তারকা মহিলা। তাঁরা শোক প্রকাশে এভাবে রাস্তায় বের হয়ে আসতে পারেন না। কারণ, তাঁদের এ কথা জানা আছে, আল্লাহ তাঁদের পর্দার আদেশ করেছেন। এসব বর্ণনা সনদের বিচারে সামান্যও প্রমাণিত নয়।

 

এসব বর্ণনা জাল ও বানোয়াট হওয়ার আরেকটি প্রমাণ দেখুন; মুহাম্মাদ ইবনু সিরিনের সূত্রে বর্ণনা করা হয়, হাসান রা. একজন মহিলাকে বিয়ে করেন। মোহর হিসেবে তাকে ১০০ দাসী দেন। প্রত্যেকের সঙ্গে আবার ১ হাজার করে দিরহাম প্রদান করেন[18]

 

এটা অসম্ভব ও অকল্পনীয় বই কি! হাসান একজন স্ত্রীকে এত অধিক পরিমাণ মোহর দেবেন! নিঃসন্দেহে এটা অপব্যয় ও মাতাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, ইসলাম যা সমর্থন করে না। ইসলাম সুন্নাহসম্মত মোহর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করে এবং বিষয়ে ইসলাম স্বল্প খরচ ও সহজতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। আর অবশ্যই বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হাসান রা. তাঁর নানা রাসুলের() আদর্শবিরোধী কাজ করতে পারেন না। নানাজানের শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অথবা শরিয়াবিরোধী কাজ হাসান রা. করতে পারেন, তা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। এ সকল বর্ণনা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন হওয়া এসব আলোচনার ভিত্তিতে সহজেই বোঝা যায়।

 

হাসানের অধিকসংখ্যক বিয়ে প্রমাণ করতে এগুলো ব্যতীত কোনো বর্ণনা নেই; অথচ এর একটাও সনদের বিচারে প্রমাণিত ও শক্তিশালী নয়। ফলে এগুলো দলিল হওয়ার উপযুক্ত নয়।[19]

[20]

 

এই সকল দুর্বল বর্ণনা ইসলামের শত্রুরা কিভাবে অপব্যবহার করেছে তা বর্ণনা করতে গিয়ে ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখ করেছেন,

 

এ সকল বর্ণনা দ্বারা শত্রুপক্ষ কীভাবে আমাদের বিরুদ্ধে সুযোগ গ্রহণ করে, তার একটা নমুনা উল্লেখ করছি। প্রাচ্যবিদ হেনরি ল্যামেন্স (Henri Lammens) হাসানের অধিক বিয়ে সম্পর্কিত আলোচনা উল্লেখ করে বলেন—“হাসান যুবক বয়সে উপনীত হয়ে বিয়ে করা ও তালাক প্রদানের খেলা শুরু করেন এবং প্রায় শতাধিক বিয়ে করেন ও তালাক দেন। এমনকি একসময় তিনি “উদভ্রান্ত ছেলে” উপাধি লাভ করেন। এতে করে আলি রা.-কে ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়তে হয়। এ দিকে হাসান প্রচুর অপব্যয় করছিলেন। আবার প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য আলি রা. পৃথক বাড়ি নির্মাণ করে তাদের জন্য দাস-দাসীর ব্যবস্থাও করে দেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, আলির খিলাফতকালে কীভাবে মুসলমানদের সম্পদ অবৈধভাবে নষ্ট করা হচ্ছিল। ফলে সে সময় মুসলমানদের মধ্যে দরিদ্রতা বৃদ্ধি পায়।[21]

 

প্রাচ্যবিদ হেনরি ল্যামেন্স হাসানের অধিক বিয়েসংক্রান্ত আলোচনা এ সকল বানোয়াট ও জাল বর্ণনার আলোকেই করেছেন। সেই সঙ্গে নিজের পক্ষ থেকে আরও কিছু বাড়িয়ে সাহাবিদের সুমহান সত্তা ও আমিরুল মুমিনিন আলির খিলাফতের বিরুদ্ধে এমন সুক্ষ্মভাবে অপবাদ আরোপ করে দিলেন, যা আর কেউ করেনি। তিনি লিখেছেন:

 

১. হাসান অত্যধিক বিয়ে ও তালাক প্রদানের মাধ্যমে পিতা আলিকে মারাত্মক ঝগড়া ও হঠকারিতার সম্মুখীন করে দেন; অথচ আলি ও হাসানের কোনো জীবনী লেখক এ সকল ঝগড়া ও ঝামেলার কথা সামান্যও উল্লেখ করেননি, প্রাচ্যবিদ হেনরি ল্যামেন্স যার ইঙ্গিত করেছেন।

 

 ২. হেনরি ল্যামেন্স লিখেছেন, হাসান রা. তার প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য পৃথক বাড়ি ও দাস-দাসীর ব্যবস্থা করে দেন; অথচ দীর্ঘ ১৪০০ বছরেও কোনো লেখক এমন তথ্য উল্লেখ করেননি। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, এগুলো বানোয়াট ও বাস্তবতাহীন কল্পকাহিনি।

 

খ্রিষ্টান গবেষকগণ, যারা ইসলামের শত্রু এবং ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ রাখে, তারা কলমের মাধ্যমে ইসলামের সুমহান ব্যক্তিদের এমনভাবে আঁচড় লাগিয়েছে যাতে ইসলামকে মন্দ হিসেবে তুলে ধরা যায়, ইসলামের সঠিক চিত্র বিকৃত করে উপস্থাপন করা যায় এবং যাদের মাধ্যমে ইসলামের সভ্যতা-সংস্কৃতি পৃথিবীব্যপী ছড়িয়েছে, যাঁরা বিশ্বব্যাপী মানবতাকে মুক্তির পথ দেখিয়েছে, তাঁদের ব্যাপারে মানুষের ভেতর সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি হয়।” [22]

 

 আমরা হাসান(রা.) এর অধিক পরিমাণে বিবাহ সংক্রান্ত সকল বর্ণনার তাহকিক দেখলাম। সনদ বিচারে এর একটিও বিশুদ্ধ নয়। কাজেই এসব বর্ণনার আলোকে তাঁর ব্যাপারে কিছু দাবি করা বা প্রমাণ করা যাবে না। আমরা আরো দেখলাম ইসলামবিরোধীরা কিভাবে এসব অপ্রমাণিত বর্ণনার সাথে নিজস্ব অপব্যাখ্যা ও ভিত্তিহীন কথা যুক্ত করে ইসলামের বিরুদ্ধে কিভাবে অপবাদ আরোপ করে।

 

হাসান(রা.) প্রকৃতপক্ষে কাদেরকে বিয়ে করেন?

ইতিহাসবিদদের মতে খাওলা ফাজারিয়া, জাদা বিনতু আশআস খাসআমিয়া, উম্মু ইসহাক বিনতু উবায়দিল্লাহ, উম্মু বিশর বিনতু আবি মাসউদ আনসারি, হিন্দ বিনতু আবদির রাহমান ইবনু আবি বকর, উম্মু আবদিলাহ; তাঁর পিতা শালিল ইবনু আবদিল্লাহ ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবি জারির ইবনু আবদিল আল বাজালির ভাই। এবং সাকিফ গোত্রের একজন মহিলা, আমর গোত্রের একজন মহিলা, শায়বান গোত্রের একজন মহিলা; প্রমুখ হাসানের স্ত্রী ছিলেন। সে যুগের নিয়ম অনুযায়ী কিন্তু এত বিয়ে করা দোষণীয় অথবা নিন্দনীয় ছিল না। অনেকেই তার চেয়েও বেশি বিয়ে করেছে। [23] তাঁর থেকে এই বিয়েগুলো প্রমাণিত। ইসলামে একসঙ্গে ৪ জন স্ত্রী রাখা এবং তালাক প্রদান বা স্ত্রীর মৃত্যুর পরে পুনরায় বিবাহ করা বৈধ বিষয়। হাসান(রা.) বৈধ কাজ ব্যতিত অবৈধ কিছুই করেননি। তাঁর ব্যাপারে ৭০, ৯০ অথবা আরো বেশি বিয়ের যে বর্ণনাগুলো রয়েছে সেগুলো অবাস্তব এবং এর একটিও সহীহ বর্ণনা নয়।

 

পঞ্চমতঃ

ইসলামবিরোধীরা হাসান(রা.)কে খারাপ মানুষ হিসেবে প্রমাণের জন্য বলার চেষ্টা করে যে তাঁকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে। তারা এমন বর্ণনাও নিয়ে আসতে চায় যাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে সম্মানিত সাহাবী মুয়াবিয়া(রা.) তাঁকে বিষ প্রয়োগ করেছেন। অথবা তাঁর পুত্র ইয়াজিদ বিষ পান করিয়েছে। অথচ এই বর্ণনাগুলো উল্লেখের পরে ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে ইমাম ইবন কাসির(র.) উল্লেখ করেছেন,

 

“…আমার মতে এই বর্ণনা সঠিক নয়। আর মু'আবিয়া (রা) এর ইশারায় বিষ পান করানোর বর্ণনা বিশুদ্ধ না হওয়াটা তো অধিকতর সুস্পষ্ট।[24]

 

মুয়াবিয়া(রা.) কখনোই হাসান(রা.)কে বিষ প্রয়োগ করেননি। অন্য কোনো সাহাবীও এই কাজ করেছেন বলে প্রমাণিত নয়। [25] তাঁকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিলো এর দ্বারা মোটেও প্রমাণ হয় না তিনি খারাপ ব্যক্তি ছিলেন বা বিলাসী জীবন করে কারো অধিকার হরণ করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। তাঁকে সম্ভবত বিভ্রান্ত সাবাঈরা অথবা খারিজিরা বিষ প্রয়োগ করেছিলো। [26] এরাই সে সময়ে সাহাবীদের শত্রু ছিলো এবং তাঁদের সাথে যুদ্ধ করতো। মহান দুই খলিফা উসমান(রা.) ও আলি(রা.)কেও এরা হত্যা করেছে। হাসান(রা.)কে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছিলো; আমরা আশা করি এর দ্বারা তিনি হুকমী শহীদের মর্যাদা পাবেন, ইন শা আল্লাহ। [27] এর দ্বারা তাঁর মর্যাদা মোটেও কমেনি বরং বেড়েছে।

 

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ " الْحَسَنُ وَالْحُسَيْنُ سَيِّدَا شَبَابِ أَهْلِ الْجَنَّةِ وَأَبُوهُمَا خَيْرٌ مِنْهُمَا " .

অর্থঃ ইবনু উমার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ() বলেছেনঃ হাসান ও হুসায়ন জান্নাতী যুবকদের নেতা এবং তাদের পিতা তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবে। [28]

 

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، رضى الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " الْحَسَنُ وَالْحُسَيْنُ سَيِّدَا شَبَابِ أَهْلِ الْجَنَّةِ " .

অর্থঃ আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ() বলেছেনঃ “আল-হাসান ও আল-হুসাইন (রাযিঃ) প্রত্যেকেই জান্নাতী যুবকদের সরদার।”  [29]

 

ষষ্ঠতঃ

ইসলামের শত্রুরা হাসান(রা.) এর চরিত্রকে কালিমালিপ্ত করার জন্য নানা দুর্বল বর্ণনা টেনে এনে অপবাদ প্রদান করে। উপরে আমরা সেগুলো পর্যালোচনা করেছি। এরপরেও তারা বলার চেষ্টা করে হাসান(রা.) স্রেফ নবী() এর নাতি ছিলেন বলে ‘পক্ষপাত করে’ ইসলামে তাঁকে এতো বড় মর্যাদা দেয়া হয়েছে, তাঁকে জান্নাতী যুবকদের সর্দার করা হয়েছে। তাঁর নাকি এমন মর্যদার কোনো যোগ্যতা ছিলো না (নাউযুবিল্লাহ) ।

 

এর জবাবে আমরা শুরুতেই বলবোঃ জান্নাত ও জাহান্নামের মালিক আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছা মর্যাদা দিতে পারেন, যাকে ইচ্ছা জান্নাত বা জাহান্নামে দাখিল করতে পারেন। আল্লাহ তা’আলার এর পূর্ণ অধিকার আছে। আমরা এর প্রতি সন্তুষ্ট ও অনুগত। যারা জান্নাতে বিশ্বাসই করে না, এ ব্যাপারে তাদের আপত্তির কোনো গুরুত্ব নেই।

 

ইসলামবিরোধীরা ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থ থেকে বিভিন্ন বর্ণনা এনে হাসান(রা.) এর দুর্নাম করার কতোই না চেষ্টা করে। অথচ যে পৃষ্ঠাগুলো থেকে নানা বর্ণনা এনে তারা হাসান(রা.) এর বদনামের চেষ্টা করে, ঐ পৃষ্ঠাগুলোতেই বিভিন্ন স্থানে হাসান(রা.) মহান সব গুণাবলির উল্লেখ আছে। কেন যেন সেগুলো তাদের চোখ এড়িয়ে যায়!

 

“‘তিনি এমন দানশীল ব্যক্তি ছিলেন যে, তার খাবার রান্নার জন্যে আগুন জ্বালালে ওই আগুনের শিখা অনেক উপরে তুলে দিতেন যাতে দূর-দূরান্তের মুসাফির ব্যক্তিরা ওই আগুন  দেখে খাবার ও আশ্রয়ের আশায় সেদিকে ছুটে আসেন। এটি তাঁর বংশীয় আভিজাত্যের ফলশ্রুতি।[30]

 

হাসান(রা.) তাঁকে বিষ প্রদানকারীর নাম পর্যন্ত প্রকাশ করেননি যাতে ছোট ভাই হুসাইন(রা.) সেই হত্যাকারীকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে না পারেন। নিজ হত্যাকারীকে তিনি শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। হাসান(রা.) এর এই মহানুভবতার দিকটি ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একটি ঘটনা। অথচ এমন মহানুভব মানুষের নামে অপবাদ দিতে ইসলামের শত্রুরা একটুও দ্বিধা করে না।  

 

তার মৃত্যু যখন খুব নিকটে তখন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বলেছিলেন যে, বিষে তাঁর নাড়ি-ভুড়ি কেটে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গিয়েছে। এ চিকিসৎক তখন বারবার হযরত হাসান (রা)-কে দেখতে আসতেন। এক পর্যায়ে হুসায়ন (রা) বললেন, ‘ভাই আবু মুহাম্মদ ! আপনি আমাকে বলে দিন, কে আপনাকে বিষ পান করিয়েছে? হযরত হাসান (রা) বললেন, কেন রে ভাই। তুমি কি করবে? হুসায়ন (রা) বললেন, আমি আপনাকে দাফন করার আগে তাকে হত্যা করব।' এখনি তাকে ধরতে না পারলে সে এমন কোন স্থানে চলে যেতে পারে যেখানে তাকে আর ধরা যাবে না।' হযরত হাসান (রা) বললেন, ‘ভাই ! দুনিয়া তো কয়েকদিনের সংসার ! এটি ধ্বংসশীল। ওকে ছেড়ে দাও। আমি এবং সে উভয়ে তো আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হব।' হযরত হাসান (রা) ওই দোষী ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেন নি।[31]

 

ক্ষমতার প্রতি মোহহীন এবং মানুষের কল্যাণপ্রত্যাশী হাসান(রা.) স্বেচ্ছায় খিলাফত ছেড়ে দিয়ে আরেকজন সম্মানিত সাহাবী মুয়াবিয়া(রা.) এর নিকট এর দায়িত্ব ন্যাস্ত করেন। [32] এমন বিরল উদার চরিত্রের মানুষদের একজন ছিলেন তিনি। 

 

عَنْ أَبِي بَكْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ أَخْرَجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ يَوْمٍ الْحَسَنَ فَصَعِدَ بِهِ عَلَى الْمِنْبَرِ، فَقَالَ " ابْنِي هَذَا سَيِّدٌ، وَلَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يُصْلِحَ بِهِ بَيْنَ فِئَتَيْنِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ "‏‏.

অর্থঃ আবূ বকরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী() ওয়াসাল্লাম একদিন হাসান (রাঃ) কে নিয়ে বেরিয়ে এলেন এবং তাঁকে সহ মিম্বারে আরোহণ করলেন। তারপর বললেন, “আমার এ ছেলেটি (নাতি) সাইয়েদ (সরদার)। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা এর মাধ্যমে বিবাদমান দু’দল মুসলিমের আপোস (সমঝোতা) করিয়ে দিবেন।”  [33]

 

সহীহ সনদে বিস্তারিত বর্ণনা উল্লেখ আছে কিভাবে নবী() এর এই হাদিসের ভবিষ্যতবাণীর বহুদিন পরে হাসান(রা.) এর মাধ্যমে মুয়াবিয়া(রা.) এবং তাঁর সেনাদলের মাঝে সমঝোতা হয়েছিলো, সেই ভবিষ্যতবাণী সত্যে পরিণত হয়েছিলো। আবূ আবদুল্লাহ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, আলী ইবনু আবদুল্লাহ তাঁকে বলেছেন যে, এ হাদিসের মাধ্যমেই আবূ বকরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাসানের(রা.) শ্রুতি তাঁদের কাছে প্রমাণিত হয়েছে। [34] এর দ্বারা মুহাম্মাদ() এর নবুয়তের সত্যতা এবং হাসান(রা.) এর মর্যাদা উভয়ই প্রমাণ হয়।

 

জান্নাতী যুবকদের সর্দার হাসান বিন আলি(রা.) এর আখলাক, দানশীলতা, সলাত, সিয়াম, কিয়াম, সাওম, যুহদ (দুনিয়াবিমুখিতা) ইত্যাদি নানা মহান গুণাবলির এতো বিপুল বিবরণ রয়েছে যা উল্লেখ করলে প্রবন্ধের কলেবর অনেক বিশাল হয়ে যাবে। যারা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী, তারা ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি (হাফি.) এর ‘হাসান ইবনু আলি রা. - জীবন ও কর্ম’ গ্রন্থের বাংলা অথবা ইংরেজি অনুবাদের ৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম পরিচ্ছেদ পড়তে পারেন। [35] ইসলামবিরোধীরা হয় অজ্ঞতাবশত নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে এই মহামানবের নামে অপপ্রচার করে থাকে। কিন্তু আল্লাহ যাঁকে সম্মানিত করেছেন তাঁর বিরুদ্ধে সকল অপপ্রচার বৃথা।

 

.... وَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هُمَا رَيْحَانَتَايَ مِنْ الدُّنْيَا

অর্থঃ "... ... নবী সাল্লাল্লাহু() বলতেন, হাসান ও হুসাইন (রাঃ) আমার নিকট দুনিয়ায় যেন দু’টি ফুল।" [36]

 

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ لِحَسَنٍ " اللَّهُمَّ إِنِّي أُحِبُّهُ فَأَحِبَّهُ وَأَحْبِبْ مَنْ يُحِبُّهُ " .

অর্থঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ() হাসান (রাঃ) সম্পর্কে বললেনঃ “হে আল্লাহ! আমি একে ভালবাসি! তুমিও তাকে ভালবাসো, আর যে তাকে ভালবাসে, তাকেও ভালবাসুন।  [37]

 

আমরা হাসান(রা.)কে ভালোবাসি। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন, জান্নাতে তাঁকে উচ্চ অবস্থান দান করুন। তাঁর প্রতি অপবাদ আরোপকারীদেরকে আল্লাহ হেদায়েত দিন।

 

 

তথ্যসূত্রঃ


[3]  ألفية العراقي في السيرة

http://islamport.com/w/ser/Web/3591/1.htm

আরো দেখুনঃ https://islamqa.info/ar/176293/

[4]  ص257 - كتاب آثار الشيخ العلامة عبد الرحمن بن يحيي المعلمي اليماني

https://al-maktaba.org/book/33522/6704#p3

আরো দেখুনঃ https://islamqa.info/ar/176293/

[5]  দেখুনঃ “Was al-Hasan ibn ‘Ali (may Allah be pleased with him) a man who married and divorced a lot?” - islamQA (Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid)

https://islamqa.info/en/176293/

https://islamqa.info/ar/176293/

https://archive.is/e0HzB (আর্কাইভকৃত)

[6] হায়াতুল ইমাম হাসান ইবনু আলি : ২/৪৪৫। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[7] মিজানুল ইতিদাল : ৩/১৩৮। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[8] লিসানুল মিজান : ৪/২৫২। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[9] লিসানুল মিজান: ৫/৩৩৯। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[10] আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১১/৩৪১। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[11]  কুতুল কুলুব : ১/২৪৬। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[12] মুহাল্লিল বলা হয়, যে ব্যক্তি কোনো মহিলাকে বিয়ে করে উক্ত মহিলাকে তালাক দেয়া প্রথম স্বামীর জন্য পুনরায় হালাল করতে। হাদিসে এমন ধরনের বিয়ে করতে নিষেধ করা হয়েছে। নবীজি() বলেছেন, মুহাল্লিল এবং যার জন্য হালাল করার কাজ করা হয়, উভয়ের উপর আল্লাহর লানত। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[13] আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/৩০৩। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[14] দিওয়ানুল মাতরুকিন ওয়াজ জুআফা: ৩৫২। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[15] আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/৩০৭। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[16] আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/৩০৫। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[17] আত-তাবাকাতুল কুবরা: ১/৩০১। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[18]  আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ১১/১৯৭৷ [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[19]  হায়াতুল ইমাম হাসান ইবনু আলি: ২/৪৫২। [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[20]  'হাসান ইবনু আলি রা. - জীবন ও কর্ম' -  ড. আলী মুহাম্মদ আস সাল্লাবী (কালান্তর প্রকাশনী থেকে অনূদিত) পৃষ্ঠা ৩৮-৪৫

[21]  দায়িরাতুল মাআরিফ : ৭/৪০০।  [ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি উল্লেখিত পাদটীকা]

[22]  'হাসান ইবনু আলি রা. - জীবন ও কর্ম' -  ড. আলী মুহাম্মদ আস সাল্লাবী (কালান্তর প্রকাশনী থেকে অনূদিত) পৃষ্ঠা ৪৫-৪৬

[23]  'হাসান ইবনু আলি রা. - জীবন ও কর্ম' -  ড. আলী মুহাম্মদ আস সাল্লাবী (কালান্তর প্রকাশনী থেকে অনূদিত) পৃষ্ঠা ৩৮

[25]  “How Al-Hasan ibn 'Ali died” (Islam web)

https://www.islamweb.net/en/fatwa/321661/

অথবা https://archive.is/wip/Lpwat  (আর্কাইভকৃত)

[26]  ‘ash-Shaybani, Muwaqif al-Ma'ari$afee Khilafat Yazeed’, 123.

'Al-Hasan ibn ‘Ali ibn Abi Talib: His Life and Times' - Dr. Ali M. Sallabi, Page 348

[27]  "A Muslim who Is Killed Unjustly Is Considered a Martyr" (Islam web)

https://www.islamweb.net/en/fatwa/83878/

অথবা  https://archive.is/wip/GLcGU (আর্কাইভকৃত)

[28]  সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস নং : ১১৮ (সহীহ)

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=9828

[29]  সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিস নং : ৩৭৬৮ (সহীহ)

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=42123

[31]আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ – ইবন কাসির (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯১

আরো দেখুনঃ “How Al-Hasan ibn 'Ali died” (Islam web)

https://www.islamweb.net/en/fatwa/321661/

অথবা https://archive.is/wip/Lpwat  (আর্কাইভকৃত)

[33] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৩৩৬৮

https://www.hadithbd.net/hadith/link/?id=3626

[34] দেখুনঃ সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ২৫২৩

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=2607

[35]  'হাসান ইবনু আলি রা. - জীবন ও কর্ম' -  ড. আলী মুহাম্মদ আস সাল্লাবী (কালান্তর প্রকাশনী থেকে অনূদিত)

https://www.rokomari.com/book/203280/hasan-ibnu-ali-ra

ইংরেজি অনুবাদ

https://www.kalamullah.com/Books/Al-Hasan%20ibn%20Ali.pdf

অথবা https://tinyurl.com/34n2h6vr

[36] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৩৭৫৩

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=28193

[37] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং : ৬০৩৮

https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=15908