ইডিপাস কমপ্লেক্স [The Oedipus Complex]

নৈতিকতা বিষয়ক



   

থিবস নগরীতে কোনো কিছুরই অভাব নেই। তারপরও রাজা লুইস আর তার স্ত্রী জকোস্টার মনে কোনো সুখ নেই। কারণ, তারা নিঃসন্তান। বহু বছর সন্তানহীন থাকার পর লুইস এক গণকের সাহায্য নিলেন। গণক ভবিষ্যদ্বাণী করলো, রাজা লুইসের যদি কোনো পুত্রসন্তান জন্মায়, তবে সে তাকে হত্যা করবে আর নিজের মা-কে বিয়ে করবে। দুঃখজনকভাবে, সে বছরেই তাদের একটি পুত্রসন্তান হলো। প্রফেসিটা ঠেকাতে রাজা লুইস ছেলেটাকে এক চাকরের হাতে তুলে দিলেন। চাকরটাকে নির্দেশ দিলেন ছেলেটাকে হত্যা করার জন্য।

 

কিন্তু এই নিষ্পাপ ছেলেটাকে হত্যা করতে লোকটার মন সায় দিলো না। তাই সে ছেলেটাকে এক রাখালের হাতে তুলে দিলো। পরবর্তীতে কয়েক হাত পালাবদল হয়ে, ছেলেটা শেষ পর্যন্ত পলিবাসের মহলে আশ্রয় পেলো। পলিবাস ছিলেন থিবসের প্রতিবেশী নগরী করিন্থের রাজা। রাজা আর রানি ছেলেটাকে নিজের ছেলের মতোই লালন-পালন করতে লাগলেন আর তার নাম রাখলেন ‘ইডিপাস’।

 

ইডিপাস খুব সুখেই রাজমহলে বড় হতে থাকলো। কিন্তু যুবক বয়সে হঠাৎ এক মাতাল তাকে “জারজ” বলে গালি দিলো। মাতালটা তাকে আরও জানালো, ইডিপাস রাজা পলিবাসের নিজের সন্তান না। ইডিপাস তার বাবা মাকে ঘটনার সত্যতা জিজ্ঞেস করলে তারা তা অস্বীকার করলেন। সত্যটা জানতে ইডিপাস এক গণকের আশ্রয় নেয়। গণক তাকে শুধু এটুকু বলে যে, ইডিপাস নিজের বাবাকে হত্যা করবে আর নিজের মা-কে বিয়ে করবে। এমন কুৎসিত পরিণতি এড়াতে ইডিপাস করিন্থ নগরী থেকে পালিয়ে যায়।

 

“বিধির লিখন, যায় না খণ্ডন” বলে একটা কথা আছে। না হলে কেন ইডিপাস করিন্থ নগরী ছেড়ে নিজের জন্মভূমি থিবসেই ফিরে আসবে? থিবসে আসার পর পরই সে এক রথের সামনে পড়ে আর রথের চালকের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। ঝগড়া এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ইডিপাস চালকটাকে হত্যা করে ফেলে। দুঃখজনকভাবে, সেই চালকটাই ছিলেন থিবসের রাজা লুইস, ইডিপাসের জন্মদাতা। এভাবে নিজের জন্মদাতাকে হত্যা করে ইডিপাস ভবিষ্যদ্বাণী আংশিক পূর্ণ করে ফেললো নিজের অজান্তেই। এক চাকর লুইসকে রাস্তায় মৃত দেখতে পেয়ে রাজমহলে অবহিত করলো। পুরো থিবস নগরীতে শোকের ছায়া নেমে আসলো।

 

থিবসের পথ চলতে চলতে ইডিপাস এক স্ফিংক্স (নারীর মাথা ও বুক, সিংহের দেহ ও ঈগলের ডানাবিশিষ্ট দানব) এর সামনে পড়লো। স্ফিংক্স পথিকদের ধাঁধা জিজ্ঞেস করতো। সঠিক উত্তর দিতে পারলে তাদের ছেড়ে দিতো আর ভুল উত্তর দিলে তাদের হত্যা করতো। দানবটা তাকে জিজ্ঞেস করলো, “কোন প্রাণী সকালে চার পায়ে, বিকেলে দুই পায়ে আর রাতে তিন পায়ে হাঁটে?” ইডিপাস উত্তর দিলো—“মানুষ।” শৈশবে তারা চারপায়ে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটে, পরিণত অবস্থায় দুইপায়ে আর বৃদ্ধাবস্থায় দুই পা আর লাঠি অর্থাৎ তিন পায়ে।

 

ইডিপাসের উত্তর সঠিক হলো। দানবটা তাকে কাঁধে নিয়ে থিবস ঘুরালো। থিবসের সবাই অবাক হয়ে তা দেখলো, কারণ ইডিপাসই প্রথম এই দানবটার কাঁধে চড়তে পেরেছে। এদিকে রাজার মৃত্যুতে রানি জকোস্টার ভাই ঘোষণা করেছিলেন, যে স্ফিংক্স এর কাঁধে চড়তে পারবে তাকেই থিবসের রাজা ঘোষণা করা হবে। তাই ইডিপাসকে থিবসের রাজা ঘোষণা করা হলো আর রাজার বিধবা স্ত্রী জকোস্টার সাথে তাকে বিয়ে দেয়া হলো। তাদের সন্তানও হলো। এভাবে ইডিপাস পুরো ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ করলো—“ছেলেটা নিজের বাবাকে হত্যা করবে আর নিজের মাকে বিয়ে করবে।”

 

বিয়ের কয়েক বছর পর রাজ্যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়লো। জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো। এ অবস্থা ঠেকাতে রাজা ইডিপাস এক গণকের আশ্রয় নিলো। গণক জানালো, যদি রাজা লুইসের হত্যাকারীর শাস্তি হয়, তবে নগরীতে শান্তি ফিরে আসবে। হত্যাকারীর পরিচয় জানতে ইডিপাস থিবসের গণক টাইরিসিয়াসের সাহায্য চাইলো। টাইরিসিয়াস তাকে তিরস্কার করলো আর তাকে রাজা লুইসের হত্যাকারীকে খুঁজতে নিষেধ করলো।

 

ইডিপাস আরও জানতে পারলো, এ নগরীতে দুর্ভিক্ষের কারণ হচ্ছে এখানে এক ব্যক্তি নিজ বাবাকে হত্যা করেছে আর মা-কে বিয়ে করেছে। করিন্থ নগরীতে থাকা অবস্থায় শোনা ভবিষ্যদ্বাণীটা ইডিপাসের মনে পড়ে গেলো। সে করিন্থ নগরীতে দূত পাঠিয়ে জানতে পারলো, রাজা পলিবাস মারা গিয়েছেন। পিতার মৃত্যুর সংবাদ শুনে ইডিপাস স্বস্তি বোধ করলো। কারণ, এখন তো আর ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়া সম্ভব না। দূত তাকে আরও জানালো যে, সে জানতে পেরেছে—ইডিপাস রাজা পলিবাসের পালকসন্তান ছিল। একথা শুনে ইডিপাস ধাঁধায় পড়ে গেলো। কারণ, রানি জকোস্টা তাকে একবার বলেছিল যে, রাজা লুইস আর রানি জকোস্টা তাদের একমাত্র সন্তানকে এক চাকরের হাতে তুলে দিয়েছিল।

 

এদিকে রানি জকোস্টা যখন সবকিছু শুনলেন, তিনি আসল ঘটনা বুঝতে পারলেন। তিনি বুঝতে পারলেন ইডিপাস আসলে তার আপন ছেলে। তিনি ইডিপাসকে নিষেধ করলেন, সে যাতে ব্যাপারটা নিয়ে আর না ঘাঁটায়। কিন্তু ইডিপাস থেমে গেলো না। যে চাকরটার হাতে রানি জকোস্টার ছেলেকে তুলে দেয়া হয়েছিল, ইডিপাস তাকে ডেকে পাঠালো। আর তার মাধ্যমেই সে জানতে পারলো, পলিবাসের পালকসন্তান আর রানি জকোস্টার পরিত্যক্ত সন্তান একই ব্যক্তি। ইডিপাস নিজে! রানি জকোস্টা তীব্র লজ্জায় আত্মহত্যা করলেন। ইডিপাস মৃত মায়ের সামনে আসলো। আর কাঁদতে কাঁদতে বললো, “তুমি আমার মা! আর আমার দুই চোখ কিনা তোমাকে কামনার দৃষ্টিতে দেখেছে!” অনুশোচনায় ইডিপাস নিজের চোখ মায়ের পোশাকের কাঁটা দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে অন্ধ করে ফেললো। চলে গেলো নির্বাসনে।

 

গল্পটা গ্রিক পুরাণ থেকে নেয়া। সত্য নাকি মিথ্যা জানার উপায় নেই। ইডিপাসের কাহিনী নিয়ে খ্রিষ্টপূর্ব ৪২৯ সালে সফোক্লিস লেখেন ‘ইডিপাস রেক্স’ নামের বিয়োগান্ত (tragedy) নাটক। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দু-দশকে প্যারিস আর ভিয়েনাতে ইডিপাসের কাহিনীকে কেন্দ্র করে বানানো মঞ্চ-নাটক ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। যা সে সময়কার বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুন্ড ফ্রয়েডকে বেশ প্রভাবিত করে। মনোবিজ্ঞানে সিগমুন্ড ফ্রয়েড বেশ বিখ্যাত (নাকি কুখ্যাত!) নাম। তিনি প্রায় সবকিছুই ব্যাখ্যা করতেন যৌনতা দিয়ে। এমনকি একটা ছেলে ছোটবেলা খেলনার প্রতি আকৃষ্ট হয়, এটাও তিনি যৌনতা দিয়ে ব্যাখ্যা করতেন। ফ্রয়েড দাবি করতেন সকল সামাজিক সম্পর্কই যৌনতাকেন্দ্রিক।[1]

 

ইডিপাসের গল্প থেকে তিনি এই উপসংহার টানেন যে, সকল ছেলেই তার মাকে কামনার বস্তু মনে করে। যার কারণে, তারা তাদের বাবার প্রতি হিংসা অনুভব করে, বাবাকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। তিনি এটার নাম দেন “ইডিপাস কমপ্লেক্স”। ফ্রয়েডের ব্যাখ্যা এতটাই হাস্যকর এবং বিকৃত যে, অনেক বিবর্তনবাদীও তার এসব উদ্ভট ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারেনি। তাদের মতে ফ্রয়েড কোনো বিজ্ঞানী নয়, বরং “গল্পকার”

 

সমকামিতা প্রমাণের ক্ষেত্রে অনেকের কাছেই ডারউইনের বিবর্তনবাদ শক্ত একটা দলিল। তাদের যুক্তি হচ্ছে, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের পূর্বপুরুষ একই হবার কারণে আচরণে আর প্রবৃত্তিতে অন্যান্য প্রাণীদের থেকে মানুষের খুব বেশি পার্থক্য নেই। তাই যদি পশুদের মধ্যে সমকামিতা থাকে, আমরা কেন তা করতে পারবো না? ঠিক একই ভাবে প্রাণীদের মধ্যে যদি ইনসেস্ট বা অজাচার বিদ্যমান থাকে, তবে আমাদের তা করতে সমস্যা কী? সমকামিতা এখন পাশ্চাত্যে মোটামুটি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এই বিকৃত যৌনাচারের যুগেও বহু মানুষ ইনসেস্টকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না। কারণ, দিনশেষে বিকৃতিরও তো একটা সীমা আছে। তাই ইনসেস্টকে বলা হয় The last taboo। কিছু বিকৃত মানুষ দাবি করে, এই স্বাভাবিক(!) প্রবৃত্তিকে স্বীকার করে নিতে পারলে নাকি আমরা পুরোপুরি মুক্ত হতে পারবো।

 

এদের জন্য আশার বাণী রেখে সম্প্রতি স্পেন আর রাশিয়া পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ইনসেস্টকে বৈধতা দিয়েছে।[2] জার্মানির ন্যাশনাল এথিক্স কাউন্সিল ভাই-বোনের অজাচারকে বৈধতা দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছে।[3] আমেরিকাও বৈধতা দেয়ার পথে এগুচ্ছে। অজাচারের ক্ষেত্রে বিকৃতমনাদের খুব প্রিয় একটা যুক্তি হচ্ছে—If animals can do it, why can’t we?”

 

প্রথমত, বিজ্ঞানীরাও স্বীকার করেন কিছু কিছু নৈতিকতা শুধু মানুষের জন্যই। আমরা যখন পশুদের আচরণের কথা বলি, তখন আমরা কখনোই “ধর্ষণ” কিংবা “বিয়ে”—এই টার্মগুলো ব্যবহার করি না। এগুলো শুধু মানুষের জন্যই স্বতন্ত্র।

দ্বিতীয়ত, প্রাণীজগতে অজাচার স্বাভাবিক, এটি একটি অসত্য কথা। জীববিজ্ঞানীরা বলেন, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রাণীজগতে ইনসেস্ট একটি বিরল ঘটনা।[4]

তৃতীয়ত, এমনকি প্রাণীদের মধ্যে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি রয়েছে যে, তারা রক্তের সম্পর্কের কারও সাথে মিলিত না হয়ে দূরবর্তী কারও সাথে মিলিত হতে চায়। এটাকে বলা হয়, ‘Sexual imprinting[5] উইকিপিডিয়াতে ইনসেস্টের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে কাজিনদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে পরিষ্কার। আমরা বলি, কাউকে আমাদের ভাই অথবা বোন হতে হলে অন্তত আমাদের বাবা কিংবা মা এক হতে হবে। জাহেলি যুগে আরবদের একটি কালচার ছিল। পিতা মারা গেলে পিতার স্ত্রী ছেলের অধিকারে চলে যেতো। এমনকি সে সময়ে মিশর, ইরান ইত্যাদি দেশে অজাচার বিদ্যমান ছিল। রাজারা নিজ কন্যাদের বিয়ে করতেন।[6] আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে পরিষ্কারভাবে এসব নিষিদ্ধ করেন:

 

“যে নারীদের তোমাদের পিতা-পিতামহ (কখনো) বিবাহ করেছে, তোমরা তাদের বিবাহ কোরো না। তবে পূর্বে যা হয়েছে, হয়েছেএটা অত্যন্ত অশ্লীল, ঘৃণ্যকর্ম এবং কুপথের আচরণ। তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, তোমাদের মেয়ে, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভাতিজি, ভাগিনি, তোমাদের সেসকল মা, যারা তোমাদের দুধপান করিয়েছে, তোমাদের দুধ-বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মা, তোমাদের প্রতিপালনাধীন তোমাদের সৎ কন্যা, যারা তোমাদের এমন স্ত্রীদের গর্ভজাত, যাদের সাথে তোমরা নিভৃতে মিলিত হয়েছো তোমরা যদি তাদের সাথে নিভৃত-মিলন না করে থাকো (এবং তাদের তালাক দিয়ে দাও বা তাদের মৃত্যু হয়ে যায়), তবে (তাদের কন্যাদের বিবাহ করাতে) তোমাদের কোনো গোনাহ নেই। তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীরাও তোমাদের জন্য হারাম এবং এটাও হারাম যে, তোমরা দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করবে; তবে পূর্বে যা হয়েছে, হয়েছে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [7]

 

বাইবেলেও ইনসেস্টকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।[8] কিন্তু দুঃখজনকভাবে একই সাথে, বাইবেলে দশটি অজাচারের গল্পও বর্ণনা করা হয়েছে।

যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:

--- লূত (আ.) এর দুই মেয়ে তাদের বাবাকে পর পর দুই রাত মদ পান করায় এবং বাবার সাথে মিলিত হয়। ফলে, মেয়ে দুইটি বাবার দ্বারা গর্ভবতী হয়ে পড়ে।[9]

--- ইবরাহিম (আ.) আর তাঁর স্ত্রী সারাহ এর বাবা একই ব্যক্তি ছিলেন। যার অর্থ, সারাহ ছিলেন ইবরাহিম (আ.) এর সৎ বোন।[10]

--- দাউদ (আ.) এর বড় ছেলে এবং সিংহাসনের উত্তরসূরি অম্নোন, তার বোন তামারকে ধর্ষণ করে।[11] দাউদ (আ.) এর আরেক ছেলে অবশোলম তার পিতার সাথে বিদ্রোহ করে খোলা আকাশের নিচে পুরো ইসরায়েলবাসীর সামনে তার পিতার উপপত্নীদের ধর্ষণ করে।[12]

 

এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমাদের মুসলিমদের আকিদা হচ্ছে, সকল নবীই (আ.) নিষ্পাপ ছিলেন। যদি এমন কোনো কিছু কোনো পূর্ববর্তী কিতাবে উল্লেখ করা হয়, যা নবীদের চরিত্রকে কলুষিত করে, তবে তা বিকৃত এবং বানোয়াট।

বর্তমানে নাস্তিকসহ অনেকেই প্রশ্ন তোলে, যদি ধর্মগ্রন্থের পবিত্র ব্যক্তি আর তাদের সন্তানেরা এসব করতে পারে আর ঈশ্বর সেটা তাঁর কিতাবে উল্লেখও করতে পারেন, তবে আমাদের এসব করতে সমস্যা কী? বর্তমানে তাই পাশ্চাত্যে ইনসেস্ট ভয়াবহ আকারে বাড়ছে।

 

বেশি না, পঞ্চাশ বছর আগেও সবাই সমকামিতার মতো ইনসেস্টকেও একটি বিকৃত যৌনাচার হিসেবে জানতো। পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৯৫৫ সালে আমেরিকাতে প্রতি মিলিয়নে কেবল একজন মানুষ অজাচারে লিপ্ত হতো।[13] আর এখন? প্রতি তিনটি মেয়ের মধ্যে একটি মেয়ে আর প্রতি পাঁচটি ছেলের মধ্যে একটি ছেলে তাদের বয়স ১৮ হবার আগেই পরিবারের কোনো সদস্য কর্তৃক শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়।[14]

আচ্ছা, আমাদের এখানে কী অবস্থা? NDTV- একটি রিপোর্টে প্রতিবেশী দেশ ভারতে অজাচারের একটি পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে।[15] পরিসংখ্যান অনুসারে, ভারতে ৫৩% শিশু শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়। ৭২% শিশুকে নীরবে এই লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়। ৬৪% অজাচারের শিকার শিশুদের বয়স ১০-১৮ বছর। ৩২% এর বয়স কেবল ২-১০।

চিন্তা করা যায়? মাত্র দুই থেকে দশ! যারা এই অজাচারের শিকার হয়, তাদের ৮৭% কে বার বার এই শারীরিক লাঞ্ছনার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। যারা আমার এই লেখা পড়ে এতক্ষণ “এমন বিকৃত টপিক নিয়ে কেন লিখছি!” এমনটা ভাবছিলেন তাদের জন্য এই পরিসংখ্যানগুলো দেয়া।

কয়েক বছর আগেও আমার ধারণার বাইরে ছিল যে, এমন বিকৃত কিছু মানবসমাজে থাকতে পারে। আর সত্যি বলতে যেকোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের নিকট এসব বিকৃত মনে হবে। আমি প্রথম ‘incest’ টার্মটার সাথে পরিচিত হই, বর্তমান সময়ে নাস্তিকদের ‘নবী’ লরেন্স ক্রাউসের সাথে হামজা যর্তযিসের এক ডিবেটে।[16]

বিতর্কের এক পর্যায়ে হামজা যর্তযিস, লরেন্স ক্রাউসকে প্রশ্ন করেন: Why is incest wrong?” (অজাচার কেন অন্যায়?) লরেন্স ক্রাউস জবাব দে, “It’s not clear (to) me that it’s wrong.” (আমার কাছে মনে হয় না যে এটা অন্যায়।) আমি জবাব শুনে থ হয়ে গিয়েছিলাম। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে পৃথিবীতে এমনও মানুষ থাকতে পারে, যারা এটাকে বৈধ মনে করতে পারে। বিতর্কের পর নাস্তিকদের আরেক ‘নবী’ রিচার্ড ডকিন্স তার টুইটার একাউন্টে উত্তরটি শেয়ার করে তার সম্মতি প্রকাশ করেন।[17]

 

বাংলাভাষী নাস্তিকদের ধর্মগ্রন্থসম ‘মুক্তমনা’ ব্লগে আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে আদনান নামে এক ব্লগার “নষ্ট রাত্রি” নামে একটি ছোটগল্প লিখে। তাতে কল্পনার অযোগ্য বিকৃতিতে লেখক বাবাকে নিয়ে দুই মেয়ের ফ্যান্টাসির কথা লিখেছে। পুরো গল্পটিতে আসলে কী ছিল, সেটি আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। আমার রুচিতে কুলোচ্ছে না।

লেখক তার অশ্লীল গল্পটাকে বিশেষায়িত করেছে এভাবে : “গল্পটি আসলে ক্ষীণদৃষ্টি, বিশ্বাসের দাসত্ব, আর নষ্টামির বিরুদ্ধে আমার, আপনার ও আমাদের একটা সংগ্রাম। আর গল্পটি বলাও হয়েছে শিশ্নটির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। কয়েকবার পড়লেই পাঠক বুঝতে পারবেন যে, মানুষ ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে চায় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে, কিন্তু আসলে ক্রমাগত সে তার নিজেরই ক্ষমতার দাস হয়ে ওঠে।”

আমার জানামতে, যে কারওর যেকোনো লেখাই মুক্তমনা ব্লগে প্রকাশ করা হয় না। মুক্তমনা ব্লগ আর তার সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই এমন বিকৃত লেখা ব্লগে রেখে প্রমাণ করেছে, তারা আসলে মুক্তচিন্তার নামে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে অশ্লীলতা আর বিকৃতমনস্কতা ছড়িয়ে যাচ্ছে।

 

আসলে ইনসেস্ট কেন ঠিক নয় সেটা নিয়ে আমার মনে হয় না কোনো কিছু লেখার প্রয়োজন আছে। যেকোনো বিকৃতিহীন মানুষের কাছেই এটা কল্পনার অযোগ্য। ইনসেস্টের কারণে Inbreeding ঘটে। যার ফলে পরবর্তী প্রজন্মে বিভিন্ন জেনেটিক ডিজঅর্ডার ঘটে থাকে।

নিচের তালিকার দিকে ভালোভাবে লক্ষ করলে আরও পরিষ্কার হবে ব্যাপারটা:

এমনকি বিবর্তনবাদও অজাচার থেকে সতর্ক করে। কারণ, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ইনব্রিডিং ঘটলে একটি প্রজাতির বিলুপ্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।[18] অনেকেই প্রশ্ন করেন, ইনব্রিডিং তো কাজিনদের বিয়ে করলেও ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। ইসলামে কেন তাহলে কাজিনদের বিয়ে করার বৈধতা দিয়েছে? একেবারে রক্তের সম্পর্কের কারও সাথে আমাদের ৫০% জিন কমন থাকার সম্ভাবনা আছে। যার ফলে খুব সহজেই ইনব্রিডিং ঘটে। কিন্তু কাজিনদের ক্ষেত্রে এটা কেবল ১২.৫%, অপেক্ষাকৃত কম।[19]

 

এতটুকু জিন কমন থাকার আশঙ্কা অন্য কোনো শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও রয়েছে। আর যতোটুকু ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে তা খুব সহজেই এড়ানো যাবে যদি আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাজিনদের বিয়ে না করি। অর্থাৎ এমন যাতে না হয় আমার বাবা তার চাচাতো বোনকে বিয়ে করেছেন, আমিও আমার চাচাতো বোনকে বিয়ে করলাম আর আমার ছেলেও তার চাচাতো বোনকে বিয়ে করলো, আর এভাবেই ব্যাপারটা চলতে থাকলো।

 

পাশ্চত্যের বিভিন্ন পরিবারের দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়—যেখানে দেখানো হয়: ভাই-বোন, মা-ছেলে কিংবা বাবা-মেয়ে বিয়ে করে একসাথে নাকি সুখী (!) সংসার যাপন করছে। বাস্তবতা কিন্তু একেবারে আলাদা কথা বলে। যেসব পরিবারে এসব বিকৃতি ঘটে থাকে, তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকে না।[20] ঝগড়া, অ্যালকোহল, ড্রাগ ইত্যাদি একদম নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।[21] যেসব মেয়ে তাদের পিতার দ্বারা এই অজাচারের শিকার হয়, তাদের অনুভূতিতে চরম রাগ, ঘৃণা, অবিশ্বাস, ভয় আর লজ্জা মিশে থাকে।[22]

 

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, Incest Taboo কে ছুড়ে ফেলার মাধ্যমে মানবসমাজ বিকৃতির চরমে পৌঁছাচ্ছে। বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে নিজেকে পশু-পাখির চেয়েও নিচের কাতারে নামাচ্ছে। ডক্টর জেফরি খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে সিগমুন্ড ফ্রয়েড একটি রূপকথাকে আমাদের সামনে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন।[23] তিনি এর নাম দিয়েছেন The Real Oedipal Complex

 

ইডিপাস কখনোই নিজের বাবাকে হত্যা করতে চায়নি, মায়ের সাথে মিলিত হতে চায়নি। সে চেয়েছে এই কুৎসিত পরিণতি থেকে বাঁচতে। কিন্তু সে তার ভাগ্য থেকে বাঁচতে পারেনি। ঠিক একই ভাবে, মানুষ কখনোই তার পরিবারের প্রতি কামুক হয়ে জন্মায় না। বরং এগুলো যে স্বাভাবিক না, এই বোধ নিয়েই সে জন্মায়। আমার খুব অবাক লাগে এই বিকৃত যৌনাচারের জয়গান গাওয়া মানুষগুলোই আবার প্রশ্ন তোলে—কেন আমাদের নবী (ﷺ) নিজের ছেলের বউকে বিয়ে করেছিলেন (মিথ্যা দাবি)। তারা বলে, আমাদের নবী (ﷺ) শিশুকামী ছিলেন (ভিত্তিহীন)। মানুষকে মুক্তির দীক্ষা দেয়ার দাবিদার মানুষগুলো তাদের কুৎসিত চিন্তা দ্বারা এতটাই পরিবেষ্টিত যে, আজ তারা নিজেদের মা-কে মা ভাবতে পারছে না, বোনকে বোন ভাবতে পারছে না। জীবন মানেই তাদের কাছে Sex & Drugs and Rock & Roll। পুরো দুনিয়াটাই তাদের কাছে Sex Object.

 

দিনশেষে এই মানুষগুলোই যে আলোকে অন্ধকার ভাববে, সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে—তাতে কি খুব বেশি অবাক হবার মতো কিছু আছে?

 

“আর আমি বহু জিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছিতাদের অন্তর রয়েছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ রয়েছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হলো উদাসীন[24]

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] Inbreeding, Incest, and the Incest Taboo, Edited by Arthur P. Wolf and William H. Durham. (Page -23)

[2] Max Planck Institute for Foreign and International Criminal Law, 14 March 2008. Retrieved 30 August 2012.

[3] http://www.independent.co.uk/news/world/europe/german-ethics-council-calls-for-incest-between-siblings-to-be-legalised-by-government-9753506.html

[4] Pusey and Wolf, “Inbreeding avoidance in animals,” (Page 202-205)

[5] Konrad Lorenz, Der Kumpan in der Umwelt des Vogels, Journal    fürOrnithologie, vol. 83 (1935), (Page. 137–213, 289–413)

[6] মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো? সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নাদাবি (পৃষ্ঠা- ৮০-৮১)

[7] আল-কুরআন, সুরা নিসা, ৪ : ২২-২৩  

[8] Holy Bible: Leviticus 18:6-12, Leviticus 18:10, Leviticus 18:12-14, Deuteronomy 27:20-23

[9] Holy bible: Genesis 19:30-38

[10] Holy bible: Genesis 20:12

[11] Holy bible: 2 Samuel 13

[12] Holy bible: 2 Samuel 16

[13] S. K. Weinberg, Incest Behavior (New York: Citadel).

[14]

https://www.theatlantic.com/national/archive/2013/01/america-has-an-incest-

   problem/272459/

[15] Incest: India's ugly secret tumbles out in series of cases-   

  https://www.youtube.com/watch?v=vA61xBnVb14&t=1s

[16] Lawrence Krauss vs Hamza Tzortzis - Islam vs Atheism Debate

  https://www.youtube.com/watch?v=uSwJuOPG4FI

[17] https://twitter.com/richarddawkins/status/312320023035273216

[18] Bateson, Optimal outbreeding in Mate Choice, ed. P. Bateson (Cambridge: Cambridge University Press, 1983), Page. 257–77.

[19] Inbreeding, Incest, and the Incest Taboo, Edited by Arthur P. Wolf and William H. Durham. (Page -39)

[20] Herman, Father-Daughter Incest, p. 71.

[21] Kathleen C. Faller, Women who sexually abuse children, Violence

and Victims, vol. 2 (1987), pp. 263–75;

[22] Patricia Phelan, “Incest and its meaning: The perspectives of fathers and daughters,” Child Abuse and Neglect, vol. 19 (1995), pp. 7–24.

[23] https://www.psychologytoday.com/blog/the-art-flourishing/201205/the-real-oedipal-complex

[24] আল-কুরআন, সুরা আল-‘আরাফ, ৭ : ১৭৯