উসমান(রা.) সংকলিত কুরআনের কপিতে আসলেই কি লিপিকারদের ভুল (Scribal Errors) বা ব্যাকরণগত ভুল ছিলো?

কুরআন সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব



 

➫ মূলঃ শায়খ মুহাম্মাদ সালিহ আল মুনাজ্জিদ

➫ অনুবাদঃ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার

 

অনুবাদকের ভূমিকাঃ উসমান(রা.) এর খিলাফতকালে সকল সাহাবীর ঐক্যমতে এক মলাটের মাঝে কুরআন সংকলন করা হয়। কুরআন সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী সাহাবীগণের সম্মিলিত পরিশ্রমের দ্বারা বেশ কয়েকটি কুরআনের কপি বা মুসহাফ তৈরি করা হয়েছিলো। আজকের দিনের সকল কুরআন সেই মুসহাফগুলোর অনুসারী। ইসলামকে ধ্বংস করতে হলে যে জিনিসটির দিকে সব থেকে বেশি আঘাত করতে হবে তা হচ্ছে কুরআন। ইসলামবিরোধীরা এ জন্য উসমানী মুসহাফের মাঝে ভাষাগত বা ব্যাকরণগত ভুল সংক্রান্ত কিছু অপ্রমাণিত বর্ণনা নিয়ে আসে এবং সেগুলোকেও অপব্যাখ্যা করে কুরআন সংকলনের দিককে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেষ্টা করে। এই প্রবন্ধে এমন কিছু বর্ণনা সম্পর্কে বিষদ আলোচনা করা হবে যার ফলে কুরআনের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণাগুলোর আসল অবস্থা সকলের সামনে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে, ইন শা আল্লাহ। মূলত আরবি ব্যাকরণ এবং উসমানী মুসহাফের রসম সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলে এ বিষয়ে কারো মনেই আর সংশয় জাগবে না।

 

ফতোয়া নং ১৩৫৭৫২: কুরআনুল কারিমের ভাষাগত ভুল সম্পর্কে কিছু মিথ্যা বর্ণনা

 

প্রশ্নঃ

উসমানী মুসহাফের সংকলন বিষয়ক কিছু বিবরণ আমার নজরে এসেছেঃ

বর্ণিত হয়েছে, কুরআনের প্রথম কপিটি নিরীক্ষা করে উসমান(রা.)  বললেন, “আমি এতে কিছু ব্যাকরণগত ভুল দেখতে পাচ্ছি কিন্তু আরবরা একে সঠিকভাবেই পড়ে নেবে কারণ এটা তো তাদের ভাষায় নাজিল হয়েছে” উক্ত বিবরণটি ইবন খতিব তাঁর ‘আল ফুরকান’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আয়িশা(রা.) থেকে আরো একটি বিবরণ উল্লেখ করেছেন। সেই বিবরণে উল্লেখ আছে, নবী(ﷺ) এর একজন স্ত্রী বলেছেন, “কুরআনের মধ্যে তিনটি ভাষাগত ভুল আছে।

যথাঃ

যখন আল্লাহ বলেছেনঃ (قَالُوا إِنْ هَٰذَانِ لَسَاحِرَانِ يُرِيدَانِ أَن يُخْرِجَاكُم مِّنْ أَرْضِكُم......)

[তারা বলল, ‘এ দু’জন অবশ্যই যাদুকর। তারা চায় তাদের যাদুর মাধ্যমে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দিতে… (সুরা ত্ব-হা ২০ : ৬৩)]”

এ ছাড়া আল্লাহ তা’আলার এই বাণীঃ

(إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالصَّابِئُونَ وَالنَّصَارَىٰ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ)

[নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইহুদি হয়েছে, আর সাবেয়ী ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের উপর ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। (সুরা মায়িদাহ ৫ : ৬৯)]

এ ছাড়া আল্লাহ তা’আলার এই বাণীঃ

(لَّٰكِنِ الرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ مِنْهُمْ وَالْمُؤْمِنُونَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ ۚ وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ ۚ وَالْمُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالْمُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أُولَٰئِكَ سَنُؤْتِيهِمْ أَجْرًا عَظِيمًا)

[কিন্তু তাদের মধ্যে যারা জ্ঞানে পরিপক্ক এবং মুমিনগণ- যারা তোমার প্রতি যা নাযিল হয়েছে এবং যা নাযিল হয়েছে তোমার পূর্বে- তাতে ঈমান আনে। আর যারা সালাত প্রতিষ্ঠাকারী ও যাকাত প্রদানকারী এবং আল্লাহ ও শেষ দিনে ঈমান আনয়নকারী, তাদেরকে অচিরেই আমি মহাপুরস্কার প্রদান করব। (সুরা নিসা ৪ : ১৬২)]

এইসব সংশয়ের ব্যাপারে আমি একটি জবাব পড়েছিলাম আহমাদ আলি ইমামের ‘কিরাআতুল কুরআন’ বইতে। তবে আমি মনে করি এসব অপযুক্তি খ্রিষ্টান মিশনারীদের তৈরি করা। এই বিবরণগুলো সঠিক কিনা তা আপনাদের নিকট থেকে জানতে চাচ্ছি। আল্লাহ আপনাদেরকে উত্তম প্রতিদান দিন।

 

উত্তরঃ

আলহামদুলিল্লাহ।

এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে গিয়ে আমরা বিস্ময় লুকাতে পারছি না যে কিভাবে কিছু শিক্ষিত লোক এবং গবেষকের মধ্যে এই ধরণের সংশয় সৃষ্টি হতে পারে। আমরা হতবাক। শুধু এ কারণে নয় যে আল্লাহ কুরআনকে সংরক্ষিত রাখবার ওয়াদা করেছেন বিধায় কুরআনের নির্ভুল থাকবার বিষয়টি যে কোনো মুসলিমেরই মেনে নেয়া উচিত। আমরা বিস্মিত কারণ এ ধরণের সংশয়মূলক তত্ত্বের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক বা যৌক্তিক ভিত্তি নেই।

 

আমরা এ প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্যকে নিচের পয়েন্টগুলোর আলোকে পর্যালোচনা করতে পারি—

 

প্রথমতঃ

আমাদেরকে এটি বুঝতে হবে যে, ব্যাকরণের বিভিন্ন বিষয়াদি ও নিয়মগুলো এমন একটি সময়কালের কথ্য ভঙ্গির আলোকে গঠিত হয় যে সময়কালকে ‘প্রামাণ্য যুগ’ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ভাষাবিদদের এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই যে, [নবী(ﷺ) এর] রিসালাতের সময়কালটি এই প্রামাণ্য যুগগুলোর একটি। সেই যুগ থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত যে কোনো আরবি শব্দ আমাদের নিকটে ব্যাকরণগত দিক থেকে প্রমাণ হিসাবে গণ্য হবে। এমনকি তা আরবি ব্যাকরণের নিয়ম হিসাবে বিবেচিত হবে।

 

দ্বিতীয়তঃ

বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝানোর জন্য আমরা আরো বলবোঃ ধরা যাক বিশেষজ্ঞদের দ্বারা ইমরুল কায়েস থেকে কিছু কবিতার লাইন বর্ণিত হয়েছে এবং এগুলো যে ইমরুল কায়েসের কবিতা তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। একজন গবেষক ইমরুল কায়েসের কবিতা থেকে সে লাইনগুলো উদ্ধৃত করলেন এবং তার দৃষ্টিতে মনে হলো এই কবিতায় কিছু ব্যাকরণগত ভুল আছে। এখন তার জন্য কি এটা ভাবা সঙ্গত হবে যে ইমরুল কায়েস তাঁর কবিতায় ‘ব্যাকরণগত ভুল’ করেছেন?!

 

এটা কি সেই ভিত্তিকেই হেয় করার শামিল নয়, যার উপর ব্যাকরণের নিয়ম-কানুন দাঁড়িয়ে আছে? এটা কি জ্ঞানের এই শাখাটিকেই ধুলিস্যাৎ করে দেবার শামিল নয়? তাহলে সেসব অজ্ঞ ব্যক্তির ব্যাপারে আমরা কী বলবো, যারা দাবি করে কুরআন কারিমে ভাষাগত বা ব্যাকরণগত ভুল আছে? সাহাবায়ে কিরাম(রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) এবং তাবিঈ (রহিমাহুমুল্লাহ)-গণ আল কুরআনকে ইতিহাসের এক ‘প্রামাণ্য যুগ’ থেকে বর্ণনা করেছেন। সেই যুগটিতে সকলেই বিশুদ্ধ আরবি (ফুসহা) বলতো। আলেম, ব্যাকরণবিদ, এ ভাষায় বাগ্মী ব্যক্তিবর্গ একই সাথে এ কুরআনকে তিলাওয়াত করেছেন এবং একে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউই এ নিয়ে কোনো আপত্তি উত্থাপন করেননি। তবে কিছু কিরাতের কথা ব্যতিক্রম যেগুলো ব্যাকরণবিদদের কাছে মুতাওয়াতির সনদে পৌঁছেনি।

 

এখানে এই অজ্ঞ ব্যক্তিই কি অধিক সমালোচনার যোগ্য হবে না বা বিভ্রান্ত হিসাবে গণ্য হবে না? নাকি সেই খাঁটি আরবরা সমালোচনার যোগ্য হবে যাদের কথামালা থেকে আরবি ভাষার নিয়মগুলো গড়ে উঠেছে?

 

তৃতীয়তঃ

আমরা যদি সে আয়াতগুলো দেখি যেগুলোতে ‘ভুল’ আছে বলে তারা ধারণা করছে, আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারবো যে সেগুলো সুপরিচিত কিছু ব্যাকরণের নিয়ম-কানুনের সাথে সম্পূর্ণরূপে সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ঐ আয়াতগুলোতে ভুল আছে এমনটি চিন্তা করা একদমই কষ্ট-কল্পনা।

 

ইমাম সুয়ুতি(র.) বলেছেন,

“আরবি ভাষাবিদরা সেই হারফগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এগুলোর ব্যাপারে অত্যন্ত উত্তমভাবে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেনঃ

এই আয়াত প্রসঙ্গে ( إنَّ هذان لساحران ) [অবশ্যই এ দুইজন যাদুকর...  (সুরা ত্ব-হা ২০ : ৬৩)] বেশ কিছু ব্যাখ্যা রয়েছেঃ

 

প্রথমতঃ  কিনানার সুপরিচিত ভাষারীতি অনুযায়ী তিন ক্ষেত্রেই (subject, object, possessive) অব্যয় পদ আসলে দ্বিবচনটি ان সহকারে ব্যবহৃত হয়। একে বনু হারিসের ভাষারীতিও বলা হয়। 

দ্বিতীয়তঃ إنَّ শব্দের ইসম (বিশেষ্য)টি যমিরের (সর্বনাম) শান হিসেবে উহ্য আছে। বাক্যটি মুবতাদা (উদ্যেশ্য) এবং খবর (বিধেয়) হয়ে আবার إنَّ এর খবর হয়েছে

তৃতীয়তঃ অনুরূপভাবে ساحران (দুইজন যাদুকর) শব্দটি একটি উহ্য মুবতাদা এর খবর। এবং এর মূল অংশটি হচ্ছে لهما ساحران

চতুর্থতঃ এখানে إنَّ এর অর্থ হচ্ছেঃ “হ্যাঁ”

পঞ্চমতঃ هذان (এই দুইজন) শব্দের ه টি إنَّ এর ইসম যেটি যমিরের কিসসা হিসেবে এসেছে। এবং এই ذان لساحران এই দুইটি হচ্ছে উদ্যেশ্য ও বিধেয়। আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি إنَّ এর পৃথক হওয়া ও ه এর একত্রিত হওয়ার দ্বারা এই দিকটি খণ্ডন করা হয়েছে।

 

আমি [সুয়ুতি(র.)] বলিঃ আমার মনে হয় এখানে আরো একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। এখানে সাহিরান (ساحران) এবং ইয়ুরিদান (يريدان) এর মধ্যে ছন্দ মেলানোর জন্য আলিফ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন سلاسلا এর সাথে নুন ব্যবহার করা হয় أغلالا এর সাথে ছন্দে মেলানোর জন্য (( من سبإ আনা হয়েছে এর সাথে نبإ এর ছন্দে মেলানোর জন্য (সুরা নামল ২৭ : ২২ এ)

 

আর আল্লাহ তা’আলার এই বক্তব্যের ব্যাপারে, (والمقيمين الصلاة) [যারা সালাত প্রতিষ্ঠাকারী.. (সুরা নিসা ৪ : ১৬২)] বেশ কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে,

 

প্রথমতঃ এটি প্রশংসার সাথে সংযুক্ত। ঠিক যেন বলা হচ্ছেঃ “আমি প্রশংসা করি...”।  এর ফলে অর্থ পরিপূর্ণ হয়।

দ্বিতীয়তঃ يؤمنون بما أنزل إليك  আয়াতটির ب অব্যয়ের সাথে এটি সংযোজিত হয়েছে। অর্থাৎ আয়াতটি আসলে দাঁড়ায়ঃ  ويؤمنون بالمقيمين الصلاة তাঁরা হচ্ছেন নবীগণ। কেউ কেউ বলেছেন তাঁরা ফেরেশতাগণ। এবং বলা হয়ে থাকে এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে দ্বীনে বিশ্বাসী যারা সলাত কায়েম করে থাকে। অর্থাৎ এখানে উদ্যেশ্য মুসলিমগণ। “المقيمين” এর উত্তরে (ব্যাখ্যায়) এটিই বলা হয়।

তৃতীয়তঃ এখানে قبل  (পূর্বে)কে উহ্য রাখা হয়েছে এবং মুযাফ ইলাহীকে তার স্থানে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, যারা তোমার পূর্বে সলাত কায়েম করেছে।

চতুর্থতঃ এটি قبلك (তোমার পূর্বে) এই শব্দসমষ্টিতে তুমি (ك) সর্বনামের সাথে যুক্ত।

পঞ্চমতঃ এটি إليك (তোমার প্রতি) এই শব্দসমষ্টিতে তুমি (ك) সর্বনামের সাথে যুক্ত।

ষষ্ঠতঃ এটি منهم (তাদের মাঝে) এই শব্দসমষ্টিতে তারা (هم) সর্বনামের সাথে যুক্ত।

 

এই ব্যাখ্যাগুলো আবুল বাক্বা’(র.) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে।

 

আল্লাহর বাণী “وَالصَّابِئُونَ” [আর সাবিঈরা... (সুরা মায়িদাহ ৫ : ৬৯)] এর ব্যাপারেও কিছু ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছেঃ

 

প্রথমতঃ এটি এমন একটি উদ্যেশ্য যেখানে বিধেয় উহ্য আছে। অর্থাৎ وَالصَّابِئُون এবং এমন আরো বাক্যসমূহ।

দ্বিতীয়তঃ এটি إن এর মাহাল (শব্দের শেষে যবর-যের-পেশ দেবার স্থান) এ এর বিশেষ্যের সাথে সংযুক্ত এদের মাহালগুলোতে মুবতাদা (উদ্যেশ্য) হিসেবে পেশ দেয়া হয়েছে

তৃতীয়তঃ এটি هادوا এই ক্রিয়াপদের কর্তার সাথে সংযুক্ত।

চতুর্থতঃ এখানে إن এর অর্থঃ হ্যাঁ। কাজেই فالذين آمنوا (অতএব যারা ঈমান এনেছে) এবং এরপরে যা এসেছে তা পেশ দেবার স্থানএবং وَالصَّابِئُون এর সাথে সংযুক্ত।

পঞ্চমতঃ এটি একবচন বোঝানোর সময়ে বহুবচন ব্যবহারের অনুরূপ। এখানে ‘নুন’ হারফুল ই’রাব।

 

এই ব্যাখ্যাগুলো আবুল বাক্বা’(র.) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে।

বক্তব্য সমাপ্ত। আল ইতকান ফি উলুম আল কুরআন, (১২৪৭-১২৪৯), তাহকিকঃ মারকায আদ দিরাসাত আল কুরআনিয়্যাহ।

 

আমরা বুঝতে পারছি এই ব্যাকরণগত আলোচনা অতি দীর্ঘ। অনেক পাঠক ব্যাকরণের ব্যাপারে এই অতি সূক্ষ্ম আলোচনা না-ও বুঝতে পারেন। তবু আমরা এগুলো উল্লেখ করলাম যাতে কুরআনকে হেয় প্রতিপন্ন করা অজ্ঞ ব্যক্তিরা আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের ব্যাপারে নিজেদের স্বল্প জ্ঞানের দিকটি ধরতে পারে। যাতে তারা মাত্রা ছাড়িয়ে না যায় এবং সুস্থ বিবেকের সীমার মধ্যে থাকে। 

 

চতুর্থতঃ

এ প্রসঙ্গে কিছু সাহাবী ও তাবিঈদের (আল্লাহ তাঁদের সবার উপর সন্তুষ্ট হোন) থেকে অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়। হাফিয সুয়ুতি(র.) এই বর্ণনাগুলোকে তাঁর আল ইতকান ফি উলুম আল কুরআন, (পৃষ্ঠা ১২৩৬-১২৫৭) কিতাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। সেখানে তিনি এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। প্রশ্নে যে হাদিসগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, আমরা এখানে আলোচনা এগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবো। যে হাদিসগুলো আয়িশা(রা.) ও উসমান ইবন আফফান(রা.) থেকে এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে।

 

প্রথম হাদিসটি আয়িশা(রা.) থেকে বর্ণিত। হিশাম ইবন উরওয়াহ(র.) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন,

“আমি আয়িশা(রা.)কে কুরআনের ব্যাকরণগত ভুলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম।” إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالصَّابِئُونَ [নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, যারা ইহুদি, সাবেয়ী... (সুরা মায়িদাহ ৫ : ৬৯)], وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ ۚ وَالْمُؤْتُونَ الزَّكَاةَ  [আর যারা সলাতে অনুবর্তিতা পালনকারী, যারা যাকাত দানকারী... (সুরা নিসা ৪ : ১৬২)] এবং  إِنْ هَٰذَانِ لَسَاحِرَانِ [এই দুইজন নিশ্চিতই যাদুকর... (সুরা ত্ব-হা ২০ : ৬৩)]

তিনি উত্তর দিলেন, “হে আমার বোনপো, এগুলো তো লিপিকারদের কাজ। তারা লিখতে গিয়ে ভুল করেছে।”

 

দুইজন কুফা নিবাসী রাবী (বর্ণনাকারী) এটি হিশাম ইবন উরওয়াহ(র.) থেকে বর্ণনা করেছেন।

 

১। আবু মুয়াবিয়া দ্বারিরঃ

এটি সাঈদ ইবন মানসুর থেকে আস সুনানে (৪/১৫০৭, নং ৭৬৯) এই শব্দে বর্ণিত আছে। এটি আবু উবায়দের ফাদ্বায়িল আল কুরআনেও (পৃষ্ঠা ২২৯, নং ৫৫৬) এবং তাঁর সূত্রে আবু আমর দানির আল মুক্বনিতে(পৃষ্ঠা ১১৯)  বর্ণিত আছে। ইবন জারির আত তাবারী তাঁর জামিউল বায়ান (৯/৩৫৯) এবং ইবন আবি দাউদ আল মাসাহিফে (পৃষ্ঠা ৪৩) উল্লেখ করেছেন।

 

২। আলি ইবন মাসহার কুফিঃ

এটি উমার ইবন শুব্বাহ থেকে তাঁর সনদ সহকারে তারিখুল মাদিনাহতে (৩/১০১৩-১০১৪) বর্ণিত আছে।

 

এমন সনদের বর্ণনা মোটেও নির্ভরযোগ্য নয়। এখানে সমস্যা হচ্ছে, মুহাদ্দিসগণ স্বয়ং হিশাম ইবন উরওয়া(র.) এর ইরাকে অবস্থানকালের বর্ণনাগুলোর সমালোচনা করেছেন। যদিও তিনি একজন সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) ইমাম। সাধারণ নীতি হচ্ছে, তাঁর থেকে প্রাপ্ত হাদিসগুলো সহীহ ও নির্ভরযোগ্য। তবে তিনি কয়েক জায়গায় ছোট কিছু ভুল করেছেন। উলামাগণ মাতান (হাদিসের মূল বক্তব্য), শাহেদ (সমর্থনকারী বর্ণনা) এবং অনুরূপ অন্যান্য বর্ণনা বিশ্লেষণ করে সেগুলো নির্ণয় করেছেন। এই হাদিসের মাতানের মধ্যে স্পষ্টত ত্রুটি রয়েছে। অন্য কোনো সনদে এর কোনো সমর্থনকারী বর্ণনাও নেই। কাজেই আমরা বলতে পারি এই বর্ণনার মাঝে ত্রুটি রয়েছে।

 

ইমাম যাহাবী(র.) বলেছেনঃ

হিশাম ইবন উরওয়া(র.) তাঁর জীবনের শেষ দিকে ইরাকে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে ইলমে হাদিস শিক্ষা প্রদান করেন। তবে সেখানে তাঁর বর্ণিত কিছু হাদিস নির্ভরযোগ্য ছিলো না। একই ব্যাপার মালিক(র.), শু’বাহ(র.), ওয়াকি’(র.) এর মতো প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য আলেমের বেলাতেও ঘটেছে।

বক্তব্য সমাপ্ত। মিযানুল ই’তিদাল (৪/৩০১)।

আরো দেখুন, ড. সা’দ হুমায়দকৃত সুনান সাঈদ ইবন মানসুরের তাহকিক (২/৬৫৯)।

আরো দেখুন, এই বর্ণনার ব্যাপারে ড. সা’দ আল হুমায়দ(হাফিযাহুল্লাহ) এর টিকা; সুনান সাঈদ ইবন মানসুরের তাখরিজে (৪/৫০৭-৫১৪)।

 

এখন কেউ যদি প্রশ্ন করেঃ তাহলে কিভাবে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহিমাহুমাল্লাহ) তাঁদের সহীহ গ্রন্থে ইরাকীদের সূত্রে হিশাম ইবন উরওয়াহ(র.) থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন? এমনকি আবু মুয়াবিয়া থেকেও হাদিস বর্ণনা করেছেন। সেখানে আপনি কিভাবে এদের বর্ণনা পরিত্যাগ করছেন? স্বয়ং সুয়ুতি(র.) পর্যন্ত তাঁর বর্ণনাকে আল ইতকান গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ১২৩৬) সহীহ সাব্যস্ত করেছেন এবং বলেছেন, এটি দুই শায়খের [ইমাম বুখারী(র.) ও ইমাম মুসলিম(র.)] শর্তে উত্তীর্ণ হয়েছে?

 

এর জবাব হচ্ছে, এই হাদিসের মাতানে স্পষ্টত ত্রুটিপূর্ণ জিনিস রয়েছে। এ জন্য একে পরিত্যাগ করা হয়। এটি অসম্ভব ব্যাপার যে আয়িশা(রা.) আয়াতগুলোকে এই ব্যাকরণগত কাঠামোসহ (শব্দের শেষ বর্ণের স্বরধ্বনি নিরুপন) রাসুলুল্লাহ(ﷺ)এর মুখ থেকে শোনেননি অথচ এগুলোকে কুরআনে কারিমের লিপিকারদের ভুল বলে অভিহীত করে দিলেন!

মুহাদ্দিসরা যদি মাতানের মধ্যে কোনো ত্রুটি পান, তাহলে তাঁরা সনদকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেন এর কোন জায়গায় সমস্যা আছে যার কারণে এই দুর্বলতা (ত্রুটি) সংঘটিত হয়েছে। এখানে এই দুর্বলতা হচ্ছেঃ হিশাম ইবন উরওয়াহ(র.) ইরাকে অবস্থানকালে এটি বর্ণনা করেছেন।

 

পরবর্তী বর্ণনাটি উসমান ইবন আফফান(রা.) থেকে। এটি তাঁর থেকে বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে।

 

১। ইবন আব্বাস(রা.) এর আযাদকৃত দাস ইকরিমাহঃ

তিনি বলেছেন, “যখন মুসহাফ লিপিবদ্ধ করা সম্পন্ন হলো, সেগুলো উসমান(রা.)কে দেখানো হলো। তিনি এর মাঝে কিছু ব্যাকরণগত (শব্দগত) ভুল খুঁজে পেলেন। কিন্তু তিনি বললেন, এগুলো পরিবর্তন করো না। আরবরা এগুলো পরিবর্তন করে নেবে অথবা ঠিক করে পড়ে নেবে। মুসহাফের লিপিকারেরা যদি ছাকিফ গোত্রের হতো আর তাদের নির্দেশনাদাতা যদি হুযাইল গোত্রের হতো, তাহলে এই ভুলগুলো হতো না।”

আবু উবায়দ থেকে ফাদ্বায়িল আল কুরআনে (২/১০৩, নং ৫৬২) বর্ণিত, ইবন আবি দাউদ থেকে আল মাসাহিফে (১/২৩৫, নং ১১০) বর্ণিত। সুয়ুতি(র.) একে আল ইতকানে (পৃষ্ঠা ১২৩৯) ইবন আনবারির আর রাদ্দ ‘আলা মান খালাফা মুসহাফ উসমান  এবং ইবন আশতাহ এর আল মাসাহিফ এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন। শেষোক্ত এই কিতাব দুইটি আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

 

এটি একটি দুর্বল বর্ণনা। কারণ উসমান ইবন আফফান(রা.) থেকে ইকরিমাহর বর্ণনাটি মুরসাল। আবু বকর(রা.), আলি ইবন আবি তালিব(রা.) এবং নবী(ﷺ) এর স্ত্রীদের থেকে তাঁর বর্ণনার অবস্থাও একই।

দেখুনঃ জামি’ আত তাহসিল (পৃষ্ঠা ২৩৯)।

 

আবু আমর দানি মুক্বনি গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ১১৫) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, এখানে উসমান(রা.) থেকে ইকরিমাহর বর্ণনার মাঝে বিচ্ছিন্নতা আছে। তাছাড়া ইবন আবি দাউদের আল মাসাহিফে ইকরিমাহকে আত-তাঈ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ইবন আব্বাস(রা.) এর আযাদকৃত দাস হিসেবে উল্লেখ করা নেই। আর তার কোনো জীবনী পাওয়া যায় না।

 

২। ইয়াহইয়া ইবন ইয়া’মুরঃ

তিনি বলেছেন, ইবন আবি দাউদ(র.) তাঁর আল মাসাহিফে (১/২৩৩) এবং ইবন আশতাহ(র.) তাঁর আল মাসাহিফে বর্ণনা করেছেন, যেমনটি সুয়ুতি(র.) তাঁর আল ইতকানে (পৃষ্ঠা ১২৪০) উল্লেখ করেছেন। এটিও একটি মুরসাল বর্ণনা। কারণ ইয়াহইয়া ইবন ইয়া’মুরের জীবনী থেকে জানা যায় যে তিনি উসমান ইবন আফফান(রা.) এর সমসাময়িক ছিলেন না। তাঁর জীবনী দেখুন, তাহযিব আত তাহযিব (১১/৩০৫) এ। ইমাম বুখারী(র.) তারিখুল কাবিরে (৫/১৭০) একে মুনকাত্বি (বিচ্ছিন্ন) বর্ণনা বলে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া এই সনদের মধ্যে কিছু মুদ্বত্বারিব (বিভ্রান্তিকর/গোলমেলে) বিষয়ও রয়েছে। একবার এটি আবদুল্লাহ ফুত্বাইবাহ অথবা ইবন আবি ফুত্বাইমাহ এর সূত্রে ইয়াহইয়া ইবন ইয়া’মুর থেকে বর্ণিত হয়েছে। আবার কখনো কখনো উল্টোভাবে বর্ণিত হয়েছে। এটি ইয়াহইয়া ইবন ইয়া’মুরের সূত্রে ইবন ফুত্বাইমাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে, যা তারিখ আল মাদিনাহতে (৩/১০১৩) উল্লেখ আছে। কখনো কখনো এটি ইয়াহইয়া থেকে নাসর ইবন আসিম এবং তাঁর থেকে কাতাদাহ বর্ণনা করেছেন। আবার কখনো কখনো তাঁর থেকে নাসরের কথা উল্লেখ না করেই ইয়াহইয়া থেকে সরাসরি বর্ণিত আছে। তারিখ আল মাদিনাহতে দেখা যায় কখনো কখনো তাঁর এবং ইয়াহইয়ার মাঝে দুইজন অন্য বর্ণনাকারী আছেন। এই বিভিন্নতাগুলোকে আল বাকিল্লানী(র.) আল ইনতিসার লিল কুরআনে (২/১৩৬-১৩৭) দেখিয়েছেন।

 

৩। আব্দুল আ’লা ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আমিরঃ

ইবন আনবারি থেকে আর রাদ্দ ‘আলা মান খালাফা মুসহাফ উসমান  গ্রন্থে বর্ণিত। যেমনটি সুয়ুতি(র.) তাঁর আল ইতকান (পৃষ্ঠা ১২৪০) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আব্দুল আ’লার জীবনী পাওয়া যায় তাহযিব আত তাহযিবে (৮৭/৬)। এখান থেকে আমরা জানতে পারি যে, আলেমদের কেউ তাকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী বলে গণ্য করেননি।

 

৪। কাতাদাহঃ

ইবন আবি দাউদ আল মাসাহিফে বর্ণনা করেছেন। সেখানে এই শব্দে বর্ণিত আছেঃ “উসমান(রা.)কে যখন মুসহাফ (যাচাই করে) দেখতে দেয়া হলো, তিনি বললেনঃ এর মাঝে ভুল আছে। তবে আরবরা একে ঠিক করে পড়ে নেবে।

এখানে সনদে একজন বর্ণনাকারীর বক্তব্যের ব্যাপারে কিছু অস্পষ্টতা আছে। কারণ এখানে বলা আছে, “আমাদের সাথী এটি বর্ণনা করেছেন।

 

উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে এই বর্ণনার সনদগুলো মোটেও সহীহ নয়। সনদের দুর্বলতাগুলো এই বর্ণনা এবং এর উৎসের সত্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

 

পঞ্চমতঃ

এই বর্ণনাগুলোর ব্যাপারে আলেমগণ থেকে কিছু জবাব পাওয়া যায়। আমরা উপরে তা সংক্ষেপে আলোচনা করেছি। যারা এ ব্যাপারে আরো উপকারিতা (জ্ঞান) অর্জন করতে চান, তাদের জন্য এখন আমরা আলেমদের দীর্ঘ উদ্ধৃতিসহ আরো আলোচনা করছিঃ

 

১। সাহাবীদের সকল মুসহাফের সাথে আলোচ্য আয়াতগুলো হুবহু এক। সালাফদের যুগ থেকেই সকল মুসলিম এই আয়াতগুলোর কিরাতের ব্যাপারে একমত। এ থেকে প্রমাণ হয় যে ওগুলোতে লিপিকারদের থেকে কোনো ব্যাকরণগত ভুল হয়নি। বরং ওগুলো যেভাবে নবী(ﷺ) এর মুখ থেকে শোনা হয়েছে, সেভাবেই লেখা হয়েছিলো।

 

২। সাহাবী ও তাবিঈগণ কুরআন কারিমকে ছড়িয়ে দেবার ব্যাপারটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। এমনকি নবী(ﷺ) এর সকল সুন্নাহকে ছড়িয়ে দেবার ব্যাপারেও তাঁদের নীতিমালা এক ছিলো। তাঁরা দ্বীনের খিদমতের জন্য নিজেদের জীবন ও সম্পদকে উৎসর্গ করেছেন। লিপিকারদের দ্বারা কুরআনুল কারিমে ব্যাকরণগত ভুল হয়ে সে অবস্থাতেই থেকে যাওয়া ছিলো অসম্ভব একটি ব্যাপার। (উসমানী মুসহাফ চূড়ান্ত হয়ে যাবার পর থেকে) আজ পর্যন্ত কারো কুরআনের মধ্যে কাউকে কোনো সংশোধণ চালাতে হয়নি। 

 

৩। উসমান(রা.) কুরআনের কপি তৈরি করে বিভিন্ন অঞ্চলে বিতরণ করতে বলেছিলেন এজন্য যাতে পাঠকারীদের মধ্যে সৃষ্ট বিতর্কের অবসান হয়। চিন্তা করুন, আসলেই যদি তাঁর সময়ে প্রস্তুতকৃত মুসহাফগুলোর মধ্যে লিপিকারদের ভুল থাকতো, আর উসমান(রা.)ও যদি সেগুলো সংশোধণ করার আদেশ না দিতেন, (তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াতো)! এমন কিছু ঘটা একেবারেই অসম্ভব। এমন চিন্তা বাস্তবতা (সুস্থ চিন্তা)র পরিপন্থী।

 

৪। উসমান(রা.) এর আলোচ্য উক্তিকে এভাবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, তিনি যে ভুলের কথা উল্লেখ করেছেন তা তিলাওয়াতজনিত ভুল। হয়তো লিপিবদ্ধ কিছু শব্দ কখনো কখনো মানুষ ঠিকভাবে পড়তে পারতো না (ভুল পড়তো)। তিনি তখন মানুষকে এই বলে আশ্বস্ত করেছেন যে, কেউ ভুলভাবে কুরআন পড়লে আরবরা নিজেরাই তা শুধরে দেবে। আবু আমর দানি(র.) এভাবেই বর্ণনাটিকে ব্যাখ্যা করেছেন।

 

৫। আয়িশা(রা.) এর আলোচ্য উক্তিকে এভাবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, তিনি ভেবেছিলেন অন্য কোনো কিরাত (মুসহাফ লেখার জন্য) বাছাই করা উত্তম হবে, যার আরবি ব্যাকরণের নিয়মের সাথে সাধারণ মানুষ অধিক পরিচিত। কাজেই তিনি লিপিবদ্ধ সেই আয়াতের বাপারে বুঝতে ভুল করেছিলেন কারণ তা আরবদের মাঝে সর্বাধিক প্রচলিত কিরাতটির চেয়ে অন্যরকম ছিলো (তবে ঐ ভিন্ন কিরাত অনুযায়ী আয়াতটির ব্যাকরণ সম্পূর্ণ সঠিক ছিলো)।

 

ইবন জারির তাবারী(র.) বলেছেন,

উবাই ইবন কা’ব(রা.) এর কিরাতে সুরা নিসার ১৬২ নং আয়াতটি এভাবে আছেঃ وَالْمُقِيمِينَ الصَّلاةَ [আর যারা সালাত প্রতিষ্ঠাকারী] তাঁর মুসহাফে আয়াতটি এভাবেই লেখা হয়েছিলো বলে বর্ণনা রয়েছে এটা যদি (উসমানী মুসহাফের) লিপিকারদের ভুল হতো, তাহলে আমাদের মুসহাফেও এর ব্যতিক্রম হতো না এতেও একই ভুলগুলো থাকতো। এখন যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থায় থাকতো না। আমাদের মুসহাফ এবং উবাই(রা.) এর মুসহাফ হুবহু এক এটিই প্রমাণ করে যে আমাদের মুসহাফের ঐ আয়াত সম্পূর্ণ সঠিক এবং এতে কোনো ভুল নেই। রাসুলুল্লাহ() এর সাহাবীরা স্বয়ং তাঁর কাছ থেকে এই আয়াতগুলো শিখেছিলেন। এখানে যদি লেখার ভুল থাকতো, তাহলে সাহাবীরা কখনো অন্য মুসলিমদেরকে ভুল জিনিসগুলো শিক্ষা দিতেন না। তারা এগুলো সংশোধন করেই পাঠ করতেন এবং উম্মাহকে সঠিক উপায়েই এগুলোর পাঠ শেখাতেন। এখন যে অবস্থায় আছে, মুসলিমগণ প্রাচীনকাল থেকে ঠিক এভাবেই এই কিরাতকে প্রচার করেছেন। এটাই সব থেকে শক্তিশালী প্রমাণ যে এগুলো সম্পূর্ণ সঠিক ও নির্ভুল। এবং এগুলোতে লিপিকারের কোনো ভুল নেই।

বক্তব্য সমাপ্ত। জামিউল বায়ান (৯/৩৯৭)। আরো দেখুনঃ আল কাশশাফ – যামাখশারী (১/৫৯০)।

 

আবু আমর দানি(র.) বলেছেনঃ

যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, উসমান(রা.) থেকে ইবন আব্বাস(রা.) এর আযাদকৃত দাস ইকরিমাহ এবং ইয়াহইয়া ইবন ইয়া’মুরের যে বর্ণনাগুলো পাওয়া যায় সেগুলো সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? যেখানে বলা হয়েছেঃ মুসহাফসমূহ লিপিবদ্ধ করা হয়ে গেলে সেগুলো উসমান(রা)কে দেখানো হলো। তিনি এতে কিছু শব্দগত (ব্যাকরণগত) ভুল পেলেন। তবে তিনি বললেন, এগুলো এ অবস্থাতেই রেখে দাও। আরবরা এগুলো ঠিকভাবে পড়ে নিতে পারবে। - এ দ্বারা কি এটাই প্রমাণ হয় না যে উসমানী মুসহাফের রসম [1] বা লিখনের মধ্যে কিছু ভুল ছিলো?

 

এর উত্তরে আমি বলিঃ এই বর্ণনাকে কোনোক্রমেই হুজ্জাহ (প্রমাণ) হিসেবে দেখানো যায় না। একে দলিল হিসেবে দেখানো সঠিক নয় দু’টি কারণেঃ

 

প্রথমতঃ সনদে সমস্যার সাথে সাথে এর শব্দচয়নের মধ্যেও সমস্যা লক্ষ করা যায়। এটি একটি মুরসাল বর্ণনাইবন ইয়া’মুর এবং ইকরিমাহ উসমান(রা.)কে দেখেননি এবং তাঁর থেকে কিছু শ্রবণও করেননি।

অধিকন্তুঃ এখানে শব্দগুলোর প্রকাশ্য অর্থ থেকেও বোঝা যায় যে এটি উসমান(রা.) এর বক্তব্য নয়। এই বর্ণনা থেকে (আপাতদৃষ্টিতে) তাঁর ব্যাপারে আপত্তিকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এই আপত্তিকর তথ্য কী করে সত্য হতে পারে যেখানে তিনি দ্বীনি নের্তৃত্বপ্রদান, দ্বীনের খিদমত এবং উম্মাহর জন্য অসামান্য নিবেদনের জন্য এতো সুপরিচিত? তিনি সব সময় মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য নিজের সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করতেন। তিনি কুরআন সম্পর্কে ইখতিলাফের অবসানের জন্যই মুত্তাকি ও নেককার সাহাবীদের সহায়তায় মুসহাফ সংকলন করেছিলেন। কাজেই এটা তো অসম্ভব ব্যাপার যে তিনি মুসহাফকে ব্যাকরণগত ভুল হওয়া অবস্থায় রেখে যাবেন যাতে তাঁর পরবর্তীতে কাউকে এগুলো ঠিক করবার দায়িত্ব নিতে হবে। সন্দেহ নেই যে তাঁর পরে যারা এসেছে তাদের কারো পক্ষে জ্ঞানে ও যোগ্যতায় তাঁর পর্যায়ে যাওয়া সম্ভব ছিলো না। কাজেই এমন কথা কারো নিকটই গ্রহণযোগ্য নয়। এবং এমনটি বিশ্বাস করা বৈধ নয়।

 

এখন কেউ যদি প্রশ্ন করেঃ

যদি এই বর্ণনাটি উসমান(রা.) থেকে সহীহভাবেও বর্ণিত হয়, তাহলে এর ব্যাখ্যা কী হতে পারে?

 

আমি বলিঃ

তাহলে এর অর্থ হবে উসমান(রা.) এখানে ‘ব্যাকরণগত ভুল’ বলতে তিলাওয়াতের ভুলকে বুঝিয়েছেন। রসম বা লিখনের মধ্যে কোনো ভুলকে বোঝাননি। কারণ কুরআনের অনেক জায়গাতেই শব্দগুলোকে যদি এর লিখন অনুযায়ী তিলাওয়াত করা হয়, তাহলে অর্থ বিপরীত হয়ে যায়। এবং শব্দটিই বদলে যায়।[2] আপনারা কি এই আয়াতগুলো দেখেননিঃ “أو لاأذبحنّه” [অথবা তাকে যবেহ করব... (সুরা নামল ২৭ : ২১)], “لاأوضعوا” [এবং তোমাদের মাঝে ছুটোছুটি করত...(সুরা তাওবা ৯ : ৪৭)] “من نبأي المرسلين” [রাসুলদের কাহিনী থেকে... (সুরা আন’আম ৬ : ৩৪)], “سأوريكم” [আমি অচিরেই তোমাদেরকে দেখাব... (সুরা আরাফ ৭ : ১৪৫)] এবং “الربوا” [সুদ... (সুরা বাকারাহ ২ : ২৭৬)] ? এই আয়াতগুলোতে এবং আরো কিছু আয়াতে লিখিত রূপের মধ্যে অতিরিক্ত ‘আলিফ’, ‘ইয়া’ এবং ‘ওয়া’ আছে। যারা লিখনের মাঝে এভাবে অতিরিক্ত অক্ষরের ব্যাপারে সঠিক নিয়ম জানে না, তারা পড়ার সময় ভুল করতে পারে। কারণ তাদের এটি জানা নেই যে এখানে কিছু অক্ষর আছে যার উচ্চারণ হয় না। তবে (যাদের এই নিয়মগুলো জানা আছে তাদের) কেউ তিলাওয়াত শুনলেই পাঠকারীর ভুল ধরে ফেলতে পারবে। এভাবে লেখা সম্পূর্ণ সঠিক এবং প্রচলিত পদ্ধতি ছিলো। তবু উসমান(রা.) বিষয়টি দেখলেন, তিনি বললেনঃ তাঁর পরবর্তীকালে যারা (কিছু শব্দের ক্ষেত্রে) এই লিখনপদ্ধতির সাথে পরিচিত নয় এবং এ ব্যাপারে যাদের জ্ঞান নেই, তারা আরবদের কাছ থেকে এটি শিখে নেবে। কারণ কুরআন তাদের ভাষায় নাজিল করা হয়েছে। আরবরা অন্যদেরকে সঠিকভাবে তিলাওয়াতের পদ্ধতি শেখাবে এবং কুরআনের রসম বা লিখনের সঠিকত্বের বিষয়টি অন্যদেরকে বুঝিয়ে দেবে

এ ব্যাপারে আমার অভিমত এটিই। এবং আল্লাহই সর্বোত্তম জানেন।

 

এখন কেউ যদি প্রশ্ন করেঃ

তাহলে বর্ণনাটির শেষাংশে উসমান(রা.) এর এই বক্তব্যের অর্থ কী? – “মুসহাফের লিপিকারেরা যদি ছাকিফ গোত্রের হতো আর তাদের নির্দেশনাদাতা যদি হুযাইল গোত্রের হতো, তাহলে এই ভুলগুলো হতো না।””

 

আমি বলিঃ

এর মানে হলোঃ তাদের লিখনপদ্ধতি এমন ছিলো যাতে শব্দগুলোর অর্থ এগুলোর লিখিতরূপের চেয়ে ভিন্ন হতো না। ভিন্ন গোত্রগুলো বাদ গিয়ে কুরাঈশ এবং অন্য যারা মুসহাফ লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পেয়েছিলো, তারা এ শব্দগুলোকে এই বিশেষ পদ্ধতিতে লিখতো। তাদের মাঝে এই লিখন পদ্ধতি প্রচলিত ছিলো। যদিও ছাকিফ এবং হুযাইল গোত্র আরবি ভাষায় অত্যন্ত বাগ্মী ছিলো, তারা সেই শব্দগুলোর ক্ষেত্রে (কুরাঈশদের) অনুরূপ লিখনপদ্ধতি অনুসরণ করতো না। যদি মুহাজির এবং আনসারদের বদলে তারা মুসহাফ লিপিবদ্ধ করার দায়িত্বে থাকতো, তাহলে তারা সেই শব্দগুলোকে এদের উচ্চারণের ভিত্তিতে লিপিবদ্ধ করতো, অর্থের ভিত্তিতে লিপিবদ্ধ করতো না। কারণ তাদের মাঝে এ ধরণের লিখনপদ্ধতি প্রচলিত ছিলো এবং তারা এভাবেই লিখতে অভ্যস্ত ছিলো। আমার মতে এটিই উসমান(রা.) এর আলোচ্য বক্তব্যটির ব্যাখ্যাযদি এই বক্তব্যটি (বিশুদ্ধ বলে) প্রমাণিত হয়, তাহলে যে কেউ একে হুজ্জাহ (প্রমাণ) হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। আল্লাহই তাওফিকদাতা। 

 

এখন কেউ যদি প্রশ্ন করেঃ

তাহলে আপনার উল্লেখিত এই বর্ণনাটির ব্যাখ্যা কী? - হিশাম ইবন উরওয়াহ(র.) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেনতিনি বলেছেন,“আমি আয়িশা(রা.)কে কুরআনের ব্যাকরণগত ভুলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম।” إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالصَّابِئُونَ [নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, যারা ইহুদি, সাবেয়ী... (সুরা মায়িদাহ ৫ : ৬৯)], وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ ۚ وَالْمُؤْتُونَ الزَّكَاةَ  [আর যারা সলাতে অনুবর্তিতা পালনকারী, যারা যাকাত দানকারী... (সুরা নিসা ৪ : ১৬২)] এবং  إِنْ هَٰذَانِ لَسَاحِرَانِ [এই দুইজন নিশ্চিতই যাদুকর... (সুরা ত্ব-হা ২০ : ৬৩)]

তিনি উত্তর দিলেন, “হে আমার বোনপো, এগুলো তো লিপিকারদের কাজ। তারা লিখতে গিয়ে ভুল করেছে।”

 

আমি বলিঃ

এর ব্যাখ্যা একদমই পরিষ্কার। উরওয়া এখানে আয়িশা(রা.)কে এটি জিজ্ঞেস করেননি যে লিখনের মধ্যে কোনো হরফ বৃদ্ধি করে ফেলা হয়েছে বা হ্রাস করা হয়েছে কিনা যার ফলে (অর্থাৎ বৃদ্ধি করার ফলে) লিখিত বক্তব্য আরো স্পষ্ট হতে পারে কিংবা (হ্রাস করার ফলে) লেখা আরো সহজ হয়ে যেতে পারে। বরং তিনি এখানে কুরআনের বিভিন্ন হারফের [3] ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছিলেন যেখানে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ছিলো। যে ভাষারীতিগুলোতে মহান আল্লাহ নবী() ও তাঁর উম্মাহকে কুরআন পাঠ করবার অনুমতি দিয়েছিলেন। তাদের সহজসাধ্যের জন্য ও প্রশস্ততার জন্য এই হারফগুলোর যে কোনো একটিকে বেছে নেবার অনুমতি ছিলো। প্রকৃত ঘটনা এটিই কাজেই কোনো প্রকার ভুল, বিভ্রান্তি বা বিচ্যুতির সুযোগই ছিলো না। কারণ এই ভাষারীতিগুলো অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও প্রচলিত আরবিরীতি। কাজেই এক্ষেত্রে তিনি [আয়িশা(রা.)] মুসহাফে লিপিবদ্ধ কোনো শব্দের অর্থের ব্যাপারে ঐ উক্তিটি করেননি। এর সাথে তাঁর উক্তির কোনো সম্পর্কই নেই। বরং উরওয়া একে ‘ভুল’ বলে অভিহীত করেছিলেন। আর আয়িশা(রা.)ও সে অনুযায়ী (রূপকভাবে) তাঁকে উত্তর দিয়েছিলেন যেন সেখানে আসলেই ‘ভুল’ হয়েছে! কিন্তু তাঁরা কেউই আক্ষরিকভাবে এটি বোঝাননি যে সেখানে আসলেই ‘ভুল’ ছিলো। কেননা (আক্ষরিকভাবে) এমনটি বলা তাঁদের পন্থা ছিলো না। এমন কোনো অভিলাষ তাঁদের ছিলো না। তাদের নিকট সব থেকে প্রসিদ্ধ ও গ্রহনযোগ্য মত হচ্ছে প্রকৃত অর্থে বা নিশ্চিত অর্থে এখানে কোনো ভুল ছিলো না। যেমনটি পূর্বেই আমরা এর জায়েয হবার দিকটি, এর প্রসিদ্ধতা এবং আরবি ভাষায় কিয়াসের ক্ষেত্রে অনুরূপ শব্দ ব্যবহারে বিষয়ে আলোচনা করেছি। এ ব্যাপারে ইজমা আছে যে একে এভাবে পড়া যাবেতাঁদের মত এখানে ভিন্ন ছিলো (অর্থাৎ  সর্বাধিক প্রচলিত হারফের থেকে অন্য একটি হারফকে তাঁরা অধিক উত্তম মনে করেছিলেন, যা অন্য সাহাবীদের মত থেকে ভিন্ন ছিলো)তবে আবু আমর ইবনুল আলা এর একটি শায বা বিচ্ছিন্ন মত রয়েছে যে একে বিশেষ ক্ষেত্রে এভাবে তিলাওয়াত করা যাবেঃ  إن هذين [এখানে সুরা ত্ব-হা’র ৬৩ নং আয়াতের কথা বলা হচ্ছে।] আলোচ্য বর্ণনার ব্যাখ্যা এটি। উম্মুল মু’মিনীন আয়িশা(রা.) ছিলেন সুউচ্চ অবস্থান ও মর্যাদার অধিকারী, দ্বীন এবং তাঁর সম্প্রদায়ের ভাষার (আরবি) ব্যাপারে প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী। এটি মোটেও নিশ্চিতভাবে বলার উপায় নেই এমন একজন ব্যক্তিত্ব অন্য সাহাবীদেরকে ব্যাকরণগত ভুল করার ব্যাপারে অভিযুক্ত করবেন অথবা লিপিকারদেরকে ভুল করবার দায়ে দোষী করবেন। আরবি ভাষা সম্পর্কে তাঁর যে বাগ্নীতা ও গভীর জ্ঞান ছিলো, এটি কেউ অস্বীকার করতে পারে না অথবা এ ব্যাপারে কেউ অজ্ঞ নয়। (এই পর্যায়ে জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও কাউকে ভুলভাবে অভিযুক্ত করা) এমনটি তাঁর ক্ষেত্রে বেমানান এবং এমনটি সত্য হওয়া সম্ভব নয়।  

 

আলেমদের কেউ কেউ উম্মুল মু’মিনীন [আয়িশা(রা.)] এর “তারা লিখতে গিয়ে ভুল করেছে” - এই বক্তব্যকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেনঃ “লিপিকারেরা ৭ আহরুফের মধ্যে জনগণের কাছে সব থেকে প্রচলিত হারফটি বেছে নিতে ভুল করেছে।” তাঁরা লিখতে গিয়ে ভুল করেছে বা তাঁদের লিখিত রূপ গ্রহণযোগ্য নয় -  তিনি এমনটি বোঝাননি। তাদের লিখিত রূপটি যদি অগ্রহণযোগ্য হতো তাহলে সকলের নিকট তা বাতিল বলে পরিগণিত হতো। যতো আগেই সেই ভুল করা হয়ে থাক না কেন অথবা যতো জায়গাতেই সেটি ছড়িয়ে যাক না কেন।  ‘لحن’ [যেটিকে সাধারণত ‘ব্যাকরণগত ভুল’ অনুবাদ করা হয়] শব্দটির ব্যাখ্যায় একে বিভিন্ন কিরাত এবং ভাষারীতি বলে উল্লেখ করা হয়েছেযেমন, [এর পক্ষে দলিল হচ্ছেঃ] উমার(রা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেরা ক্বারী উবাই। তবে তাঁর কিছু لحن এর দিকে আমরা তাঁকাই না।” এখানে (لحن দ্বারা) বিভিন্ন কিরাত ও ভাষারীতি বোঝানো হয়েছে। এখানে এই বিষয়টি স্পষ্ট।

আল্লাহই তাওফিকদাতা।

বক্তব্য সমাপ্ত। মুক্বনি (১১৮-১১৯)

 

ইমাম সুয়ুতি(র.) বলেছেন,

 

এ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণঃ

প্রথমত, কিভাবে এমন কথা আমাদের চিন্তায় আসতে পারে যে সাহাবীরা কথা বলার সময়ে ব্যাকরণগত ভুল করতেন, যেখানে তাঁরা আরবি ভাষায় সব থেকে পারদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। সেখানে কুরআন লিপিবদ্ধ করবার সময়ে ভু্ল করবার চিন্তা তো দূর অস্ত!

দ্বিতীয়ত, যে কুরআন তাঁরা স্বয়ং নবী() এর নিকট থেকে যেভাবে নাজিল হয়েছিলো ঠিক সেভাবে শিখেছিলেন, সেই কুরআনের ক্ষেত্রে কিভাবে তাঁরা ব্যাকরণগত ভুল করতে পারেন?! যে কুরআনকে তাঁরা হিফজ করেছিলেন, যথার্থভাবে শিখেছিলেন এবং যে ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন সর্বাধিক দক্ষ?

তৃতীয়ত, এই কথা কিভাবে কারো চিন্তায় আসতে পারে যে সাহাবীরা সবাই মিলে একই ভুল করলেন এবং সেই ভুলভাবেই তা মুসহাফের মধ্যে লিপিবিদ্ধ করলেন?! 

চতুর্থত, এটা কেউ কিভাবে ভাবে যে ঐ ভুল তাঁদের সবার নজর এড়িয়ে যাবে আর তাঁরা কেউই তা সংশোধণ করবেন না? !

 

উপরন্তু, কারো মনে এই চিন্তা কিভাবে আসে যে – উসমান(রা.) [সব দেখেও] তাঁদেরকে সেই ভুলগুলো ঠিক করতে নিষেধ করবেন?!!

এই কথা কিভাবে ভাবা সম্ভব যে, কুরআনের পাঠ সেই ভুলগুলো সহই চলে আসবে?! যেখানে কুরআন সেই সালাফদের যুগ থেকেই মুতাওয়াতিরভাবে বর্ণিত হয়ে আসছে?

 

যুক্তি, শরয়ী, বাস্তবতা এই সকল প্রকার দৃষ্টিকোণ থেকেই এমনটি (মুসহাফে ব্যাকরণগত ভুল) হওয়া অসম্ভব।

এ ব্যাপারে আলেমগণ তিনভাবে জবাব দিয়েছেনঃ

 

প্রথমতঃ এমন কিছু উসমান(রা.) থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত নেই। এর সনদ যঈফ (দুর্বল), মুদ্বত্বারিব (ত্রুটিপূর্ণ) এবং মুনক্বাত্বি’ (বিচ্ছিন্ন)। তাছাড়া উসমান(রা.) এই মুসহাফকে ‘ইমাম’ হিসেবে সংকলন করতে চেয়েছিলেন যাকে সবাই অনুসরণ করবে। তাহলে এটা কিভাবে সম্ভব যে তিনি এতে কিছু ব্যাকরণগত ভুল দেখবেন আর এরপরেও তা আরবরা পড়ার সময় শুধরে নেবে বলে (সেগুলো সংশোধণ না করেই) রেখে যাবেন?! যারা মুসহাফ সংকলনের দায়িত্বে ছিলো, কুরআনের বিভিন্ন অংশ সংগ্রহ করেছে এবং এক মলাটের মাঝে একত্রিত করেছে - তাঁরাই এগুলো সংশোধণ করেননি। অথচ এ কাজের জন্য তাঁরাই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তাঁরা না করলে এই কাজ করবার মতো আর কে আছে?!

 

তাছাড়া তিনি একটিমাত্র মুসহাফ লিপিবদ্ধ করেননি।  বরং তিনি কয়েকটি মুসহাফ লিপিবিদ্ধ করেছিলেন। কাজেই যদি এমনটি বলা হয়ঃ এই সবগুলো কপির মধ্যেই ব্যাকরণগত ভুল (!) ছিলো, সেক্ষেত্রে একই ভুল সবগুলো কপির মধ্যেই হয়েছে এমনটি ভাবা হবে কষ্ট-কল্পনা। আর যদি ধরে নেয়া হয় যে কিছু কপির মধ্যে ভুল হয়েছিলো, তাহলে এটা স্বীকার করে নেয়া হচ্ছে যে অন্য কপিগুলো ঠিক ছিলো। কিন্তু কোনো বর্ণনাতেই এটি বলা নেই যে একটিমাত্র মুসহাফে ভুল হয়েছে এবং অন্যগুলোতে ভুল হয়নি। ভিন্ন কিরাতের ক্ষেত্র বাদে মুসহাফগুলোর মাঝে কখনোই ভিন্নতা দেখা যায়নি। কিন্তু সেটি তো কোনো ব্যাকরণগত ভুল নয়!

 

দ্বিতীয়তঃ যদি এই বর্ণনাকে সহীহ বলেও ধরে নেয়া হয়, তাহলে এর ব্যাখ্যা হবে, এখানে স্বরচিহ্ন বা সংকেতের কথা বোঝানো হচ্ছে যেগুলো উহ্য ছিলো। যেমন الكتب (আল কিতাব - বই), الصبرين (আস সবিরীন – ধৈর্যশীলগণ) এবং এই জাতীয় শব্দগুলো [যেখানে দীর্ঘ উচ্চারণের আলিফ উহ্য আছে]।

 

তৃতীয়তঃ একে এভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়, এখানে সেই শব্দগুলোর কথা বোঝানো হয়েছে যেগুলোর উচ্চারণ এদের রসম বা লিখিত রূপের চেয়ে ভিন্ন হয়। যেমন, “ولاأوضعوا [এবং তোমাদের মাঝে ছুটোছুটি করত...(সুরা তাওবা ৯ : ৪৭)],أو لاأذبحنّه” [অথবা তাকে যবেহ করব... (সুরা নামল ২৭ : ২১)] – এই শব্দগুলোতে লামের পর একটা আলিফ আছে (যার উচ্চারণ হয় না) আবার, “جزاؤا الظالمين” [...যালিমদের কর্মফল(সুরা হাশর ৫৯ : ১৭)] এখানে ওয়া ও আলিফ আছে (যেগুলো অনুচ্চারিত থাকে)। আবার, “بأييد” [ক্ষমতাবলে... (সুরা যারিয়াত ৫১ : ৪৭)] এখানে ২ টি ইয়া আছে (যার একটি ইয়া অনুচ্চারিত থাকে)। এই শব্দগুলোকে যদি তাদের লিখিত রূপ অনুযায়ী পাঠ করা হয়, তাহলে ব্যাকরণগত ভুল সংঘটিত হবে।

 

এটি এবং এর পূর্বের জবাবটি প্রদান করেছেন ইবন আশতাহ(র.), ‘কিতাবুল মাসাহিফ’ গ্রন্থে।

 

ইবন আনবারি(র.) ‘আর রাদ্দ ‘আলা মান খালাফা মুসহাফ উসমান গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে উসমান(রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসগুলোর ব্যাপারে বলেছেনঃ

 

এগুলোর দ্বারা কোনো প্রমাণ প্রতিষ্ঠা হয় না। কারণ এগুলোর সনদ মুনক্বাত্বি (বিচ্ছিন্ন) এবং অখণ্ড নয়। উসমান(রা.) ছিলেন তাঁর সময়ে মানুষদের নেতা, উম্মাহর ইমাম এবং তাঁদের আদর্শ। তিনি যে মুসহাফ সংকলন করেছিলেন তা ছিলো ইমামস্বরূপ আর এর দ্বারা তিনি তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। সেই মুসহাফের মধ্যে ভুল দেখা গেলো, আর তিনি সেই ভুল দেখেও তা সংশোধণ করার ব্যবস্থা নিলেন না - যুক্তি-বুদ্ধি কখনোই এমন কথার পক্ষে সায় দেয় নাআল্লাহর শপথ, কোনো ইনসাফকারী বোধসম্পন্ন মানুষের মনে এমন (উদ্ভট) চিন্তা আসতে পারে না। এমন কারো নিকটেই এটা বিশ্বাসযোগ্য নয় যে তিনি সেই ভুলগুলোকে তাঁর পরবর্তী লোকেরা এসে সংশোধণ করবে সে জন্য রেখে যাবেন। যেখানে তাঁর পরবর্তীদের জন্য সেই রসমকে অনুসরণ ব্যতিত আর কোন উপায় ছিলো না। উসমান(রা.) এর এই উক্তিঃ “আমি এতে কিছু ভুল দেখতে পাচ্ছি” থেকে কেউ কেউ দাবি করতে চায় তিনি বুঝিয়েছেন যে – তিনি এর লিখনের মাঝে ভুল দেখতে পাচ্ছিলেনআর আমরা যদি একে ঠিকভাবে পাঠ করি তাহলে লিখিত রূপের ত্রুটিগুলো থেকে শব্দগুলো বিকৃত হয়ে ব্যাকরণগত ভুলজনিত সমস্যা সৃষ্টি হবে না। - যারা এমনটি বলেন তারা ভুলের মধ্যে আছেন। কারণ উচ্চারণের উপর ভিত্তি করেই পাঠ করা হয় কাজেই কেউ যদি লেখায় ভুল করে, তাহলে পাঠ করবার সময়েও তা থেকে ভুল হবে কুরআনের শব্দ ভুল করা সংশোধণের মতো কাজে উসমান(রা.) কখনোই দেরি করতেন না; হোক তা ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করা বা ভুলভাবে উচ্চারণ করা এটি সকলেরই জানা যে, উসমান(রা.) সর্বদা কুরআন শিখতেন, এর শব্দগুলো আয়ত্ব করবার জন্য সদা সচেষ্ট থাকতেন বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরিত মুসহাফগুলো যে রসমে লিপিবিদ্ধ করা হয়েছিলো, সে অনুযায়ী এগুলো পাঠ করবার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সুদক্ষ

 

তিনি [সুয়ুতি(র.)] এর স্বপক্ষে আবু উবায়দ(রা.) এর বর্ণনা উদ্ধৃত করেন। তিনি বলেছেন, আব্দুল্লাহ ইবন মুবারক(র.) এর সূত্রে আব্দুর রহমান ইবন মাহদি আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেনঃ উসমান(রা.) এর আযাদকৃত দাস হানি আল বারবারির সূত্রে ইয়েমেনবাসী বৃদ্ধ আবু ওয়ায়ল বর্ণনা করেছেনঃ আমি উসমান(রা.) এর সঙ্গে ছিলাম যখন তাঁর নিকট মুসহাফগুলো দেখানো হচ্ছিলো। তিনি আমাকে একটা ভেড়ার কাঁধের হাড় দিয়ে উবাই ইবন কা’ব(রা.) এর নিকট পাঠালেন। হাড়টার উপরে লেখা ছিলোঃ “لم يتسن আরো লেখা ছিলোঃ “لا تبديل للخلق” এবং “فأمهل الكافرين তিনি কালির দোয়াত আনতে বললেন এবং দুইটি লাম (ل) এর একটি [للخلق  শব্দ থেকে] মুছে ফেললেন। এবং লিখলেনঃ “لِخَلْقِ اللَّهِ” [আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে... (সুরা রুম ৩০ : ৩০)] তিনি “فأمهل” শব্দটি মুছে ফেললেন এবং লিখলেন “فَمَهِّلِ” [অবকাশ দাও...(সুরা ত্বারিক্ব ৮৬ : ১৭)]। আর তিনি লিখলেনঃ “لَمْ يَتَسَنَّهْ” [সেগুলোতে কোনো পরিবর্তন হয়নি...(সুরা বাকারাহ ২ : ২৫৯)]। তিনি এর মাঝে হা (ه) যুক্ত করলেন। [এভাবে লিপিকারদের কিছু ভুলকে তিনি সংশোধণ করলেন।]

 

ইবন আনবারি(র.) বলেছেন, “কিভাবে কেউ এমন দাবি করে যে তিনি [উসমান(রা.)] কিছু ভুল দেখেও সেগুলোকে সেভাবেই রেখে দেবেন?! যেখানে তিনি সর্বদা যাচাই করে দেখতেন (মুসহাফে) কী লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে লিপিকারদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য হলে তাঁর নিকট সেটি উত্থাপন করা হতো যার দরুণ তিনি ন্যায়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিতেন এবং তাদেরকে সঠিক জিনিসটি লিখতে জোর দিতেন। আর একেই চূড়ান্ত হিসেবে নিতে বলতেন।”

 

এর সমর্থনে ‘আল মাসাহিফ’ গ্রন্থে  ইবন আশতাহ(র.) এর বর্ণনা রয়েছে তিনি বলেন,

“আল হাসান ইবন উসমান আমাদের নিকট বলেছেনঃ সিওয়ার ইবন শুআইবের সূত্রে রাবি’ ইবন বদর আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেনঃ আমি ইবন যুবায়রকে মুসহাফের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম তিনি বললেনঃ এক ব্যক্তি উমার(রা.) এর নিকট এলো এবং বললোঃ “হে আমিরুল মু’মিনীন, লোকজন কুরআনের ব্যাপারে মতপার্থক্য করছে।” উমার(রা.) তখন কুরআনকে একত্রিত করা এবং এক কিরাতের উপর আনার কথা চিন্তা করলেন। কিন্তু তাঁকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছিলো এবং এর ফলে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। অতঃপর উসমান(রা.) এর খিলাফতকালে সেই ব্যক্তিই এ বিষয়টি উসমান(রা.) এর নিকট উত্থাপন করলো। অতঃপর উসমান(রা.) কুরআনকে একত্রিত করলেন এবং মুসহাফ সংকলন করলেন। তিনি আমাকে আয়িশা(রা.) এর নিকট পাঠালেন। আমি (মুসহাফের) পৃষ্ঠাগুলো সাথে করে নিয়ে গেলাম এবং তাঁকে দেখালাম। তিনি সেগুলো যাচাই করলেন। এরপর তিনি [উসমান(রা.)] অন্য সকল কপি ধ্বংস করে দিতে বললেন।”

 

এর দ্বারা বোঝা গেলো যে তাঁরা মুসহাফগুলোকে যাচাই করতেন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতেন। কোনো কিছু সংশোধণ করার দরকার হলে তারা সেগুলোকে ছেড়ে যেতেন না বরং সেগুলো সংশোধণ করতেন।

 

অতঃপর ইবন আশতাহ(র.) বলেনঃ মুহাম্মাদ ইবন ইয়া’কুব আমাদেরকে অবহিত করেছেনঃ আবু দাউদ সুলাইমান ইবন আল আশআছ আমাদেরকে জানিয়েছেনঃ আহমাদ ইবন মাস’আদাহ আমাদেরকে জানিয়েছেনঃ ইসমাঈল আমাদেরকে জানিয়েছেনঃ আব্দুল ‘আলা ইবন আবদুল্লাহ ইবন আমিরের সূত্রে আল হারিস ইবন আব্দুর রহমান আমার নিকট বর্ণনা করেছেনঃ যখন মুসহাফ লিপিবদ্ধ করা সম্পন্ন হলো, একে উসমান(রা.) এর নিকট আনা হলো। তিনি এটি দেখলেন। এরপর বললেনঃ “তোমরা বেশ ভালো করেছো। আমি এর মাঝে কিছু জিনিস দেখছি, তবে আমরা একে আমাদের ভাষা অনুযায়ী ঠিক করে নিতে পারবো।”

 

এই বর্ণনার মাঝে কোনো সমস্যা নেই (অর্থাৎ এটি সহীহ বর্ণনা) আর এটির দ্বারা পূর্বের বর্ণনাগুলোর মানেও পরিষ্কার হচ্ছে। মুসহাফ লিপিবিদ্ধ করা শেষ হবার সাথে সাথেই তাঁর [উসমান(রা.)] নিকট তা দেখানো হয়েছিলো।  এবং তিনি দেখলেন কিছু কিছু জায়গায় কুরাঈশদের উচ্চারণ থেকে ভিন্ন পদ্ধতিতে লেখা হয়েছিলো। যেমনটি হয়েছিলো ‘التابوة’ বা ‘التابوت’ শব্দের ক্ষেত্রে [এই শব্দটি গোল তা (ة) অথবা লম্বা তা (ت) যে কোনোটি দিয়েই লেখা যায়] তিনি সংকল্প  করেছিলেন যে কুরাঈশদের ভাষা অনুযায়ী সেগুলো লিপিবদ্ধ করা হবে। [4] তিনি মুসহাফ যাচাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সেই সংকল্প পূর্ণ করেন। তিনি এর মাঝে (সংশোধণ করতে হবে এমন ) কোনো কিছুকেই ছেড়ে যাননি বা বাদ দেননি। (দুর্বল বিবরণগুলোর ব্যাপারে, যেগুলোতে বলা হয়েছে উসমান(রা.) মুসহাফের মাঝে ব্যাকরণগত ভুল দেখেছিলেনঃ ) হতে পারে যারা তাঁর থেকে ওগুলো বর্ণনা করেছে তারা ভুল  করেছে (শব্দ বদলে দিয়েছে)। উসমান(রা.) কী বলেছিলেন তারা তা ভালো করে বুঝতে পারেনি। ফলে এ ব্যাপারে তাদের মাঝে বিভ্রান্তি ছিলো। এ প্রসঙ্গে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী জবাব। আল্লাহর জন্যই যাবতীয় প্রশংসা।

 

আয়িশা(রা.) এর হাদিসের ব্যাপারে জবাবগুলো শক্তিশালী নয়। যেমন, কিছু জবাবে বলা হয়েছে এর সনদ দুর্বল। অথচ এর সনদ সহীহ যা আপনারা দেখেছেন। [5] আরেকটি জবাবে বলা হয়েছে স্বরচিহ্ন বা সংকেতের কথাতবে শব্দগুলোর ব্যাপারে উরওয়ার প্রশ্নের সাথে তা মেলে না।

 

এ ব্যাপারে ইবন আশতাহ(র.) এবং তাঁর অনুরূপ ইবন জাব্বারাহ জবাব প্রদান করেছেন। যা উল্লেখ আছে ‘শারহুর রাইয়াহ’ গ্রন্থে। আর তা হলোঃ “তারা (লিখতে গিয়ে) ভুল করেছে” – এই কথার অর্থ হলো তাঁরা ৭ আহরুফ থেকে জনগণের মাঝে সর্বাধিক প্রচলিত হারফকে বেছে নেওয়ার (ব্যাপারে ভুল করেছেনঅর্থাৎ তাঁরা সর্বাধিক প্রচলিত হারফ বেছে নিতে পারেননি। অন্য একটি হারফ বেছে নিয়েছিলেন)তবে এর মানে এই নয় যে তাঁরা যা লিপিবদ্ধ করেছিলেন তা ভুল বা নাজায়েজ। তিনি বলেনঃ, এর প্রমাণ হলো, তাঁদের লিপিবদ্ধ করা শব্দগুলো যদি নাজায়েজ (ভুল) হতো তাহলে সকলেই তা পরিত্যাগ করতো। যদিও সেই ভুল বহুকাল আগে করা হয়ে থাকে।

 

তিনি বলেনঃ সাঈদ ইবন যুবায়রের বক্তব্যঃ “লিপিকারদের পক্ষ থেকে ভুল হয়েছে” – এর মানে হলো কিরাত এবং ভাষাগত রীতির ভুল। অর্থাৎ লিপিকার ঐ স্থানে যে কিরাত এবং ভাষারীতিতে অভ্যস্ত ছিলেন সে অনুযায়ী লিখেছেন। আর ঐ স্থানে অন্য কিরাতও প্রযোজ্য। এরপর তিনি ইব্রাহিম নাখাঈ(র.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ “إِنْ هَٰذَانِ لَسَاحِرَانِ[এ দু’জন অবশ্যই যাদুকর… (সুরা ত্ব-হা ২০ : ৬৩)] এবং “إن هذين لساحران” একই কথা (উভয়ই ২টি বৈধ কিরাত)। ‘আলিফ’ দিয়ে লেখা হোক আর ‘ইয়া; দিয়ে লেখা হোক। এবং “وَالصَّابِئُونَ” [আর সাবিঈরা... (সুরা মায়িদাহ ৫ : ৬৯)] এখানেও ‘ওয়া’ এর বদলে ‘ইয়া’ দেয়া যায়।

 

ইবন আশতাহ(র.) বলেনঃ

অর্থাৎ, এখানে একটি অক্ষরের বদলে অন্য অক্ষর দেয়া একই কথা। যেমন, الصلوة  (সলাত বা নামায), الزكوة (যাকাত), الحيوة (জীবন/আয়ু) এই শব্দগুলো। [কুরআনে এই শব্দগুলোকে ‘ওয়া’ দিয়ে লেখা হয় কিন্তু এগুলোর উচ্চারণ দীর্ঘ আলিফের মতো হয়।]

 

এবং আমি বলিঃ

পাঠের ক্ষেত্রে ‘ইয়া’ যুক্ত করে পড়া এবং লেখার ক্ষেত্রে যদি ‘ইয়া’ বাদ রাখা হতো তাহলে জবাবটি উত্তম হতো। তবে পাঠটি যদি লিখিত রূপের অনুপাতে হয় তাহলে জবাবটি উত্তম হয় না। [6]  

বক্তব্য সমাপ্ত। আল ইতকান ফি উলুম আল কুরআন, (পৃষ্ঠা ১২৪১-১২৪৭)

আরো দেখুনঃ মাজমু আল ফাতাওয়া – শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া (১৫/২৫২-২৫৫)

 

আল্লাহই সর্বোত্তম জানেন।

 

মূল ফতোয়ার লিঙ্কঃ

○ আরবিঃ https://islamqa.info/ar/135752/

○ ইংরেজিঃ https://islamqa.info/en/135752/ 

 

 

অনুবাদকের টিকা

[1] Rasm – Wikipedia

https://en.wikipedia.org/wiki/Rasm

[2] অনেক ভাষাতেই এমন রীতি রয়েছে। যেমন, বাংলা ভাষায় ‘ঐতিহ্য’, ‘সহ্য’, ‘বাহ্যিক’, ‘উহ্য’ এই শব্দগুলোকে যেভাবে লেখা হয়, পড়বার সময়ে এগুলোর উচ্চারণ এমন হয় না। বরং ‘হ’ এর উচ্চারণ ‘য’ এর মতো করে করতে হয়। ‘পদ্মা’, ‘আত্মা’ এই শব্দগুলোর লিখিত রূপে ‘ম’ যুক্ত থাকলেও এগুলোর উচ্চারণ হয় না। ‘হৃদয়’, ‘হ্রাস’, ‘হ্রদ’ - লিখিত রূপে ‘হ’ থাকলেও এই ‘হ’গুলো উচ্চারণের সময়ে আর থাকে না। বাংলাতে এমন আরো অনেক শব্দ দেখা যায়। ইংরেজি ভাষায় ‘Nation’, ‘Enough’, ‘Pseudo’ এই শব্দগুলোসহ অনেক শব্দেই উচ্চারণ এর লিখিত রূপের অনুরূপ হয় না। ‘Nation’ এ ti এর উচ্চারণ sh এর মতো হয়, ‘Enough’ এ gh এর উচ্চারণ f এর মতো হয়, আবার ‘Pseudo’ শব্দের লিখিত রূপে p থাকলেও এর উচ্চারণ হয় না। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় এই শব্দগুলোকে তাদের লিখিত রূপ অনুযায়ী উচ্চারণ করা হলে এগুলো থেকে সঠিক অর্থ প্রকাশ পাবে না এবং এগুলো ভুল উচ্চারণ বলে বিবেচিত হবে।

[3] আল্লাহ তা’আলা ৭টি পদ্ধতি বা হারফ (বহুবচনে আহরুফ) এ কুরআন নাজিল করেছেন। এ প্রসঙ্গে সহীহসূত্রে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এ আহরুফগুলোতে কিছু জায়গায় ভিন্ন অর্থের শব্দও ছিলো। তবে অর্থ কাছাকাছি থাকতো, বিপরীত হতো না। স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা এই আহরুফগুলোতে কুরআন নাজিল করে এগুলোর অনুমোদন দিয়েছেন। এই হারফগুলোর সবগুলোই পাঠ করা বৈধ ছিলো। আল্লাহ এগুলো থেকে যে কোনো একটি হারফ বেছে নেবার অনুমতি দিয়েছিলেন। সাহাবীগণ ৭ আহরুফের ১ হারফে কুরআন সংকলন করেছেন।

[4] এ সম্পর্কে বিস্তারিত দেখুনঃ সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৪৬১৯ এবং ইবনু হাজার, ফাতহ, ৮:৬৭৮

[5] কোনো কোনো আলেমের ইজতিহাদ অনুযায়ী এই বিবরণ দুর্বল। যা ইতিমধ্যেই এ প্রবন্ধেই আলোচনা করা হয়েছে। যদিও সুয়ুতি(র.) এর সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করতেন।

[6] এটি সুয়ুতি(র.) এর অভিমত। তবে অপরাপর মতগুলোও আরবি ভাষা অনুযায়ী সঠিক। -- অনুবাদ সম্পাদক