মিরাজের ঘটনায় রাসুল(ﷺ) ও উম্মে হানী(রা.) এর উপর ইসলামবিরোধীদের নোংরা অপবাদের জবাব

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব



 

একজন মুমিনের শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার হচ্ছে আল্লাহর দিদার লাভ। ইসরা ও মিরাজের রাতে আল্লাহ তা’আলা রাসুলুল্লাহ(ﷺ)কে ৭ আসমান পরিভ্রমণ করিয়ে তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের মহান সম্মানে ভূষিত করেছেন। কিন্তু মহানবীর  মহান সম্মানকে কলঙ্কিত করতে সদা প্রস্তুত ইসলামবিরোধীরা এই রাতকে কেন্দ্র করেও জঘন্য সব অপবাদমূলক গল্প তৈরি করে রেখেছে। এমন অশালীন সেসব মিথ্যাচার, যা আলোচনা করতেও রুচিতে বাধে। কিন্তু আল্লাহর প্রিয় বান্দা নবী করীম(ﷺ) এর নামে মিথ্যা এ অপবাদের খণ্ডন করতে এ নিয়ে কিছু আলোচনা করতে হচ্ছে। আল্লাহই সাহায্যস্থল।

 

বাংলাদেশের বিভিন্ন নাস্তিক্যবাদী ব্লগ ও ফেসবুক গ্রুপগুলোতে প্রতি বছর শবে মিরাজের মৌসুম এলেই নাস্তিক-মুক্তমনাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। শুরু হয় নবী(ﷺ) এর ইসরা-মিরাজের ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ এবং নানামুখী পোস্ট দেবার প্রতিযোগিতা। তারা দাবি করেঃ মিরাজের রাতে নাকি নবী(ﷺ) চাচাতো বোন উম্মে হানী(রা.) এর বাড়ীতে তাঁর সঙ্গে অবৈধ কাজ করেন (নাউযুবিল্লাহ) এবং সে কাহিনীকে ধামাচাপা দেবার জন্য মিরাজের কাহিনী তৈরি করেন (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক)। এই অশালীন অভিযোগের পেছনে তারা যে ঘটনাকে ‘দলিল’ হিসাবে দাঁড় করায় তা হলোঃ

 

মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন, মুহাম্মদ ইবন সাইব কালবী.... উম্মে হানী বিনতে আবু তালিব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ()-এর মিরাজ সম্পর্কে বলেন, যেই রাত্রে রাসুলুল্লাহ()-এর মিরাজ সংঘটিত হয় সেই রাতে তিনি আমার বাড়ীতে শায়িত ছিলেন। ঈশার সলাত শেষে তিনি ঘুমিয়ে যান। আমরাও ঘুমিয়ে যাই। ফজরের সামান্য আগে তিনি আমাদেরকে জাগালেন তিনি সালাত পড়লেন এবং আমরাও তাঁর সাথে [ফজরের] সালাত পড়লাম তখন তিনি বললেনঃ হে উম্মে হানী, তোমরা তো দেখেছো আমি তোমাদের সাথে ঈশার সালাত পড়ে তোমাদের এখানেই শুয়ে পড়ি। কিন্তু এরপরে আমি বাইতুল মুকাদ্দাস গমন করি এবং সেখানে সলাত আদায় করিএখন ফজরের সলাত তোমাদের সাথে পড়লাম যা তোমরা দেখলে উম্মে হানী বলেন, এই বলে তিনি চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। আমি তাঁর চাদরের কিনারা ধরে ফেললাম। ফলে তাঁর পেট থেকে কাপড় সরে গেল। তা দেখতে ভাঁজ করা কিবতী বস্ত্রের মত স্বচ্ছ ও মসৃণ। আমি বললাম : হে আল্লাহর নবী! আপনি এ কথা লোকদের কাছে প্রকাশ করবেন না। অন্যথায় তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলবে এবং আপনাকে কষ্ট দেবে। কিন্তু তিনি বললেন : আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই তাদের কাছে এ ঘটনা ব্যক্ত করব। তখন আমি আমার এক হাবশী দাসীকে বললাম ; বসে আছো কেন, জলদি, রাসূলুল্লাহ্()-এর সঙ্গে যাও, তিনি লোকদের কি বলেন তা শোনো, আর দেখো তারা কী মন্তব্য করে ... ...  [1]  

 

মুসনাদ আবু ইয়ালা থেকে অনুরূপ আরো একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন ইবন কাসির(র.)। রেওয়ায়েতটি ইমাম তাবারানী(র.) এর মু’জামুল কাবিরেও আছে। [2]

 

আমরা দেখলাম যে, মিরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ(ﷺ) তাঁর চাচাতো বোন উম্মে হানী(রা.) এর বাড়ীতে ছিলেন বলে কিছু বর্ণনা আছে। অন্যান্য ইতিহাস ও সিরাত গ্রন্থগুলোতেও মূলত এই মূল উৎসগুলোর বর্ণনাই উল্লেখ আছে।

 

ইসলামবিরোধীদের আলোচ্য অপবাদের জবাবে যা বলবোঃ

 

প্রথমতঃ

একটি বিবরণ থেকে কোনো তত্ত্ব প্রমাণ করতে হলে প্রথমে যাচাই করে দেখতে হয় সেটি কতটুকু নির্ভরযোগ্য বর্ণনা। মিরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ(ﷺ) উম্মে হানী(রা.) এর বাড়ীতে ছিলেন এই মর্মে যে দুইটি রেওয়ায়েত বা বিবরণ উপরে উল্লেখ আছে এর ১মটির ব্যাপারে ইবন কাসির(র.) এর অভিমত হচ্ছেঃ এতে কালবী নামে একজন রাবী (বর্ণনাকারী) আছেন যিনি মুহাদ্দিসীনদের নিকট বর্জিত। [3] অর্থাৎ বর্ণনাটি কোনো সহীহ বর্ণনা নয়। এ ছাড়া মুসনাদ আবু ইয়ালা এবং ইমাম তাবারানী(র.) এর মু’জামুল কাবিরে অন্য যে রেওয়ায়েতটি আছে, সেটির বর্ণনাকারীদের একজন হচ্ছেনঃ আব্দুল আ'লা ইবন আবু মুসাওয়ির। তার ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের অভিমত হচ্ছেঃ তিনি কাযযাব (মিথ্যাবাদী)। [4] কাজেই তার বর্ণিত হাদিস সহীহ নয়।

 

অর্থাৎ মিরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ(ﷺ) উম্মে হানী(রা.) এর বাড়ীতে ছিলেন এই মর্মে যে বিবরণগুলো আছে সেগুলো বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত নয়।

 

তাছাড়া এখানে অন্যান্য বিশুদ্ধ বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক তথ্য পাওয়া যায়। যার ফলে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে এ বর্ণনা অশুদ্ধ।  

 

উম্মে হানী(রা.) এর ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে বিশুদ্ধ মত উল্লেখ করে ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবী(র.) বলেছেন,

تأخراسلامها واسلت يوم الفتح

অর্থঃ তাঁর [উম্মে হানী(রা.)] ইসলাম গ্রহণে বিলম্ব হয় এবং তিনি মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন।  [5]

 

মক্কা বিজয়ের দিন উম্মে হানী(রা.)কে ইতিহাসের বিভিন্ন দৃশ্যপটে দেখা যায়। তাঁকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি ঘটনা সিরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। এ দিনে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে নাজরানের দিকে চলে যান। [6] স্ত্রী উম্মে হানীর(রা.) ইসলাম গ্রহণের খবর শুনে তাঁকে তিরস্কার করে একটি কবিতা রচনা করেন। বিভিন্ন সিরাত গ্রন্থে সেই কবিতাটি দেখা যায়। [7]

 

উম্মে হানী(রা.) যদি মক্কা বিজয়ের সময়ে ইসলাম গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে তিনি কী করে এর এক দশক আগে মিরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর সাথে সলাত আদায় করেন?!! তিনি তো তখনও মুসলিমই হননি। অথচ মিরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ(ﷺ) উম্মে হানী(রা.) এর বাড়ীতে থাকার বিবরণের মধ্যে দেখা যায় যে তিনি তাঁর বাড়ীর লোকদের নিয়ে রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর সাথে সলাত আদায় করছেন! এ থেকে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় যে এ বিবরণ মোটেও সহীহ নয়। অথচ এমন অনির্ভরযোগ্য বিবরণ ব্যবহার করে রাসুলুল্লাহ(ﷺ) ও উম্মে হানী(রা.) এর নামে জঘন্য অপবাদ রটনা করে ইসলামের শত্রুরা।

 

দ্বিতীয়তঃ

অনেক অজ্ঞ ইসলামবিরোধী এক্টিভিস্টকে বলতে দেখা যায় যেঃ  কোনো কিছু নিজেদের মতের বাইরে গেলেই নাকি মুসলিমরা সেটাকে জোর করে যঈফ (দুর্বল) বর্ণনা বানিয়ে দেয়। উলুমুল হাদিস সম্পর্কে চরম অজ্ঞতা এবং অহেতুক জেদের কারণে তারা এই জাতীয় কথা বলে। একজন মুসলিমের পক্ষে নিজের খেয়াল খুশীমতো কোনো বর্ণনাকে সহীহ (বিশুদ্ধ), যঈফ (দুর্বল) এসব জিনিস বলে দেয়া সম্ভব নয়। উলুমুল হাদিস শাস্ত্রের দীর্ঘ নানা প্রক্রিয়া অতিক্রম করে একজন মুহাদ্দিস বিভিন্ন বর্ণনা সম্পর্কে এইসব রায় প্রদান করেন।

 

তবু আমরা ঐসব অজ্ঞ লোকদের জন্য তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি যে - মিরাজের রাতে রাসুল(ﷺ) এর উম্মে হানী(রা.) এর বাড়িতে থাকার বিবরণগুলো নির্ভরযোগ্য। এবার আমরা এর বিশ্লেষণ করি।

 

১)

ঐ বিবরণগুলোর কোনো জায়গায় কি এই উল্লেখ আছে যে রাসুল(ﷺ) উম্মে হানী(রা.) এর সাথে কোনোরূপ অবৈধ কর্ম করেছেন (নাউযুবিল্লাহ) বা কেউ তাঁকে এ জন্য অভিযুক্ত করেছে?

উত্তর হচ্ছে – না। কোথাও এ উল্লেখ নেই যে তিনি এমন কিছু করেছেন বা কেউ তাঁকে এহেন কর্মের জন্য অভিযুক্ত করেছে। এর দূরতম কিছুও কোনো জায়গায় উল্লেখ নেই। তিনি তো আরবের আল আমিন। বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী। কেউ তাঁকে কখনো এমন কিছুর জন্য অভিযুক্ত করেনি।

 

ঐ বিবরণে শুধু এটা উল্লেখ আছে যে রাসুল(ﷺ) তাঁর চাচাতো বোনের বাড়ীতে ঈশার সলাত আদায় করেছেন, নিদ্রা গেছেন, সকালে সবাইকে নিয়ে ফজরের সলাত পড়েছেন এবং এরপর বাইতুল মুকাদ্দাসে তাঁর ইসরা ভ্রমণের কথা বলেছেন। যে বিবরণকে ‘দলিল’ ধরে ইসলামবিরোধীরা রাসুল(ﷺ) এর নামে বাজে কথা বলে, খোদ সেই বিবরণেই সামান্যতমও এ উল্লেখ পাওয়া যায় না যে, কেউ রাসুল(ﷺ) এর নামে তাঁর চাচাতো বোনের সাথে অবৈধ কর্ম করার অভিযোগ করেছে। যেখানে ঐ যুগের লোকেদের মাথাতেই এমন চিন্তা এলো না বা তারা  কোনোরূপ অভিযোগ করলো না, সেখানে দেড় হাজার পরে মুক্তচিন্তার দাবিদার কিছু মানুষ নতুন করে এই জিনিস বানালো। আসলে সমস্যা তো ঐ সকল নাস্তিক-মুক্তমনার মস্তিষ্কে, যারা সাধারণ জিনিসের ভেতর থেকেও সীমাহীন অশ্লীলতা বের করে ফেলতে পারে। নিজ মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য বানোয়াট অভিযোগ সৃষ্টি করতে তাদের একটুও বাধে না।

 

২)

উম্মে হানী(রা.) এর মূল নাম ফাখতা। তিনি ছিলেন নবী(ﷺ) এর চাচা আবু তালিবের কন্যা। আকীল, জাফর এবং আলী(রা.) এর বোন। [8] নবী(ﷺ) ছোটবেলা থেকে চাচা আবু তালিবের কাছে মানুষ হন। চাচাতো ভাই-বোনদের সাথে ছোটবেলা থেকেই তিনি একসাথে বড় হয়েছেন। মিরাজের ঘটনা ঘটেছিল মক্কায়, পর্দার বিধান তখনো নাজিল হয়নি। যে চাচাতো বোনের সাথে তিনি ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছেন, তাঁর বাড়ীতে স্বাভাবিকভাবেই তিনি আসা-যাওয়া করতেই পারেন। ঐ বর্ণনাতে এমনই একটি জিনিসের উল্লেখ আছে। এমন স্বাভাবিক একটি জিনিস থেকে একমাত্র বিকৃত যৌনোন্মাদ ছাড়া আর কেউ অশ্লীল অভিযোগ তুলতে পারে না। এইসব বিকৃত অভিযোগের দ্বারা ‘মুক্তচিন্তার’ ধ্বজাধারীরা মূলত নিজেদের কুৎসিত চিন্তা-চেতনার স্বরূপই উন্মোচন করেছে।

 

৩)

উপরে উম্মে হানী(রা.) যে রেওয়ায়েত উল্লেখ করা হয়েছে সেখান আমরা দেখেছি, ঘটনার বর্ণনা এভাবে আছে –

“ঈশার সলাত শেষে তিনি ঘুমিয়ে যান। আমরাও ঘুমিয়ে যাই। ফজরের সামান্য আগে তিনি আমাদেরকে জাগালেন তিনি সালাত পড়লেন এবং আমরাও তাঁর সাথে [ফজরের] সলাত পড়লাম তখন তিনি বললেনঃ হে উম্মে হানী, তোমরা তো দেখেছো আমি তোমাদের সাথে ঈশার সলাত পড়ে তোমাদের এখানেই শুয়ে পড়ি। কিন্তু এরপরে আমি বাইতুল মুকাদ্দাস গমন করি এবং সেখানে সলাত আদায় করিএখন ফজরের সলাত তোমাদের সাথে পড়লাম যা তোমরা দেখলে

[فصلى العشاء الآخرة ثم نام ونمنا، فلما كان قبيل الفجر أهبنا رسول الله

 فلما صلی الصبح وصلينا معه قال : يا أم هانئ، لقد صليت معكم العشاء الآخرة كما رأيت بهذا الوادي، ثم جئت بیت المقدس فصليت فيه، ثم صليت صلاة الغداة معكم الآن كما ترین ]

আমরা দেখছি যে উম্মে হানী(রা.) এখানে বলছেন - নবী(ﷺ) ‘তাদের’ সঙ্গে সলাত আদায় করেছেন। মূল আরবিতে সব জায়গায় সর্বনামগুলো বহুবচনে আছে। অর্থাৎ উম্মে হানী(রা.) মোটেও বাড়ীতে একা ছিলেন না। বাড়ীর অন্য লোকেরাও সেখানে ছিলো। রেওয়ায়েতের পরবর্তী অংশে উল্লেখ আছেঃ

 

“...আমি [উম্মে হানী(রা.)] বললাম, ‘হে আল্লাহর নবী! আপনি  [ইসরা  মিরাজ এর] কথা লোকদের কাছে প্রকাশ করবেন না, অন্যথায় তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলবে  আপনাকে কষ্ট দেবে

কিন্তু তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই তাদের কাছে  ঘটনা ব্যক্ত করবো তখন আমি আমার এক হাবশি দাসীকে বললাম, ‘বসে আছো কেন? জলদি রাসুলুল্লাহ () এর সঙ্গে যাও, তিনি লোকদের কী বলেন তা শোনো, আর দেখো তারা কী মন্তব্য করে  [9]

 

অর্থাৎ বাড়ীতে উম্মে হানী(রা.) এর দাসী ছিলো বলেও উল্লেখ আছে।

 

নাস্তিক-মুক্তমনারা এমনভাবে  অপপ্রচার চালায় যেন রাসুল(ﷺ) গোপনে উম্মে হানী(রা.) এর বাড়ী গিয়েছিলেন এবং তা ধামাচাপার জন্য মিরাজের কাহিনী বলেছেন (নাউযুবিল্লাহ) ! অথচ আলোচ্য রেওয়ায়েতে দেখা যাচ্ছে রাসুল(ﷺ) মোটেও গোপনে উম্মে হানী(রা.) এর বাড়ী যাননি বরং বাড়ীতে অন্যান্যরাও ছিলো। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে তাদের অপবাদ কতোটা অসার ও ভিত্তিহীন।

 

ধরা যাক একজন মানুষ শিশুকাল থেকে তার চাচার বাড়ীতে চাচাতো ভাই-বোনদের সাথে বেড়ে উঠেছেন। বড় হবার পর একদিন তিনি তার চাচাতো বোনের বাড়ীতে বেড়াতে গেলেন। বাড়ীতে পরিবারের অন্যরাও ছিলো। রাতের বেলা তিনি সে বাড়ীতেই ঘুমালেন।

 

এই গল্পে কি আপনি কোনো অস্বাভাবিকতা বা অশ্লীলতা পাচ্ছেন? গল্পের লোকটির মধ্যে কোনো লাম্পট্য পাচ্ছেন? পাচ্ছেন না। কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ এখান গল্পের ঐ লোকটি সম্পর্কে বাজে চিন্তা করবে না। কিন্তু বাংলার নাস্তিক-মুক্তমনারা তাদের অসুস্থ চিন্তাধারার কারণে এই গল্প থেকেও নানা অশ্লীল জিনিস বের করে ফেলতে পারবে। কোনো ভালো জিনিসকে কালিমালিপ্ত করতে এদের জুড়ি নেই। আসলে যার স্বভাব যেমন, সে তেমন জিনিসই অনুসন্ধান করে। কথায় আছে - ফুল থেকে মৌমাছি নেয় মধু আর ভিমরুল নেয় বিষ।

 

৪)

আলোচ্য রেওয়ায়েতের শেষাংশে উল্লেখ আছে –

 

“… রাসুলুল্লাহ() বের হয়ে গিয়ে লোকদের এ ঘটনা জানালেন। তারা বিস্মিত হয়ে বললো, ‘হে মুহাম্মাদ! এ যে সত্য তার প্রমাণ? এমন ঘটনা তো আমরা কোনোদিন শুনিনি।’ তিনি বললেন, ‘প্রমাণ এই যে, আমি অমুক উপত্যকায় অমুক গোত্রের একটি কাফেলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সহসা আমার বাহন জন্তুটির গর্জনে তারা ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তাদের একটি উট হারিয়ে যায়। আমি তাদের উটটির সন্ধান দিই। আমি তখন শামের দিকে যাচ্ছিলাম। এরপর সেখান থেকে ফিরে আসার পথে যখন দাজনান পর্বতের কাছে পৌঁছি, তখন সেখানেও একটি কাফেলা দেখতে পাই। তারা সকলে নিদ্রিত ছিল। তাদের কাছে একটি পানিভরা পাত্র ছিল, যা কোনো কিছু দিয়ে ঢাকা ছিল। আমি সে ঢাকনা সরিয়ে তা থেকে পানি পান করি। এরপর তা আগের মতো করে ঢেকে রেখে দিই। আর এর প্রমাণ এই যে—সে কাফেলাটি এখন বায়যা গিরিপথ থেকে ‘সানিয়াতুত তানঈমে’ নেমে আসছে। তাদের সামনে একটি ধূসর বর্ণের উট আছে, যার দেহে একটি কালো ও আরেকটি বিচিত্র বর্ণের ছাপ আছে।’”

 

উম্মে হানী(রা.) বলেন, “একথা শোনামাত্র উপস্থিত লোকেরা সানিয়ার দিকে ছুটে গেলো। তারা ঠিকই সম্মুখভাগের উটটিকে রাসুলুল্লাহ () এর বর্ণনামতো পেলো। তারা কাফেলার কাছে তাদের পানির পাত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। তারা বললো, ‘আমরা পানির একটি ভরা পাত্রে ঢাকনা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। জাগ্রত হওয়ার পর পাত্রটিকে যেমন রেখেছিলাম তেমনই ঢাকা পাই, কিন্তু ভেতর পানিশূন্য ছিল।’ তারা অপর কাফেলাকেও জিজ্ঞেস করলো। সে কাফেলাটি তখন মক্কাতেই ছিল। তারা বললো, ‘আল্লাহর কসম! তিনি সত্যই বলেছেন। তিনি যে উপত্যকার কথা বলেছেন, সেখানে ঠিকই আমরা ভয় পেয়েছিলাম। তখন আমাদের একটি উট হারিয়ে যায়। আমরা অদৃশ্য এক ব্যক্তির আওয়াজ শুনতে পাই,যে আমাদের উটটির সন্ধান দিচ্ছিলো। সেমতে আমরা উটটি ধরে ফেলি।”  [10]

 

আমরা দেখছি যে এখানে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) উপস্থিত লোকদেরকে তাঁর ইসরা-মিরাজ ভ্রমণের সত্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। সকলকে এমন কিছু জিনিস বলে দিয়েছেন যা সাধারণ কোনো মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব না। যার দ্বারা সকলের সামনে তাঁর নবুয়তের সত্যতা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিলো। [11] নাস্তিক-মুক্তমনারা ঘটনার শুরুর অংশ থেকে অপব্যাখ্যা করে রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর নামে কাল্পনিক অশালীন অভিযোগ তৈরি করে, কিন্তু বর্ণনার শেষাংশে যে ইসরা-মিরাজের তথা তাঁর নবুয়তের সত্যতা প্রমাণিত হয়ে গেছে, তা কিন্তু উল্লেখ করে না! কেন এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড??

 

তারা অবশ্যই বর্ণনার শেষাংশ উল্লেখ করতে চাইবে না কারণ ওটা উল্লেখ করলে তো তাদের ভ্রান্ত মতাদর্শের কবর রচনা হয়ে যায়। মুহাম্মাদ(ﷺ) এর মুজিজা এবং নবুয়ত স্বীকার করে নিতে হয়। কাজেই বর্ণনার ঐ অংশটা তাদের ধামাচাপা দিয়ে রাখতেই হয়।

 

সম্পূর্ণ আলোচনার সারাংশ হিসাবে বলা যায়ঃ

 

ক) মুহাম্মাদ(ﷺ) এর নামে অপবাদ দেবার জন্য যে রেওয়ায়েত (বিবরণ) ব্যবহার করা হয় তা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়। বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয় এমন অনির্ভরযোগ্য বিবরণ থেকে কোনো আকিদা বা কোনো তত্ত্বের পক্ষে দলিল দেয়া যায় না।

খ) আলোচ্য বিবরণ যদি তর্কের খাতিরে বিশুদ্ধ বলেও ধরে নেয়া হয়, তবুও এর দ্বারা নাস্তিক-মুক্তমনাদের দাবি প্রমাণ হয় না। মুহাম্মাদ(ﷺ) এর নামে যে অপবাদ দেয়া হয়, আলোচ্য বিবরণে ঘুণাক্ষরেও সে অপবাদের স্বপক্ষে কোনো তথ্য নেই। বরং ঐ বিবরণ দ্বারা এমন অভিযোগ সত্য হওয়া যে কতোটা অসম্ভব সে প্রমাণই পাওয়া যায়। নাস্তিক-মুক্তমনাদের অভিযোগটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও তাদের মস্তিষ্কপ্রসূত।

গ) উপরন্তু, আলোচ্য বিবরণের শেষাংশে ইসরা-মিরাজের তথা মুহাম্মাদ(ﷺ) এর নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ আছে। এ বিবরণকে দলিল হিসাবে নিলে মুহাম্মাদ(ﷺ)কে সত্যবাদী এবং নবী হিসাবে মেনে নিতে হবে।

 

সব শেষে যা বলবঃ উপরের দিকে তাঁকিয়ে সূর্যকে থুথু দিতে চাইলে সে থুথু কখনো সূর্য অবধি পৌঁছে না। বরং ঐ থুথু নিজের গায়েই পড়ে। আর সূর্য তার মতোই কিরণ দিয়ে যায়। আল্লাহর হাবিব মুহাম্মাদ(ﷺ) এর নামে মিথ্যা অপবাদ দিতে গিয়ে নাস্তিক-মুক্তমনারা বরং নিজেদের কুৎসিত মন-মানসিকতাকে সকলের সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছে। তারা তো এমন বিবরণকে এ অপবাদের কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছে যাকে দলিল হিসাবে ধরলে ইসরা-মিরাজের সত্যতা তথা মুহাম্মাদ(ﷺ) এর নবুয়তের সত্যতাকেই মেনে নিতে হয়। কিন্তু তা মানার সৎ সাহস কি তাদের আছে?

 

আরো পড়ুনঃ

 

মিরাজের রাতে নবী(ﷺ) কি আসলেই ডানাওয়ালা ঘোড়ায় করে আসমানে গিয়েছেন?

 

কা'বা ও আল আকসা নির্মাণের সময়ের ব্যাবধান সম্পর্কে হাদিসের তথ্য কতটুকু সঠিক?

 

মিরাজের রাতে নামায ৫০ থেকে ৫ ওয়াক্ত হবার দ্বারা কি আল্লাহর বাণী বা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়েছে?

 

মিরাজের যাত্রা শুরুর স্থান নিয়ে হাদিসে কি স্ববিরোধিতা আছে?

 

নবী (ﷺ) এর ইসরা ও মিরাজ: ইসরার ঘটনার সত্যতা কতটুকু? মাসজিদুল আকসা (বাইতুল মুকাদ্দাস) কি আসলেই সে সময়ে ছিল?

 

 

তথ্যসূত্রঃ

[1]তাফসির ইবন কাসির, ৬ষ্ঠ খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), সুরা বনী ইস্রাঈলের ১ নং আয়াতের তাফসির, পৃষ্ঠা ২৫১ [মূল আরবিঃ ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০]

সীরাতুন নবী (সা.) - ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), পৃষ্ঠা : ৭৬

[2]তাফসির ইবন কাসির, ৬ষ্ঠ খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), সুরা বনী ইস্রাঈলের ১ নং আয়াতের তাফসির, পৃষ্ঠা ২৫১-২৫৩

মু’জামুল কাবির – তাবারানী, ২৪/৪৩২

[3] তাফসির ইবন কাসির, ৬ষ্ঠ খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), সুরা বনী ইস্রাঈলের ১ নং আয়াতের তাফসির, পৃষ্ঠা ২৫১

[4] তাফসির ইবন কাসির (আরবি), তাহকিকঃ সামি বিন মুহাম্মাদ আস সালামাহ, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪২, টিকা নং ৮

[5] সিয়ারু আ’লামিন নুবালা – শামসুদ্দিন যাহাবী ২/৩১২

[6] আনসাবুল আশরাফ ১/৩৬২; আসহাবে রাসুলের জীবনকথা – মুহাম্মাদ আব্দুল মা’বুদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৯

[7] ইবন হিশাম ২/৪২০; উসুদুল গাবা ৫/৬২৮; ইবন দুরাইদ; আল ইশতিকাক ১৫২; আসহাবে রাসুলের জীবনকথা – মুহাম্মাদ আব্দুল মা’বুদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৯

[8] ইবন হিশাম ২/৪২০; আ’লাম আন নিসা ৪/৪১৪; আল ইসতি’আব ২/৭৭২; আসহাবে রাসুলের জীবনকথা – মুহাম্মাদ আব্দুল মা’বুদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৮

[9] সীরাতুন নবী (সা.) - ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), পৃষ্ঠা : ৭৬

[10] সীরাতুন নবী (সা.) - ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), পৃষ্ঠা : ৭৬-৭৭

[11] উম্মে হানী(রা.) এর গৃহে অবস্থানের ঘটনাটির বিবরণ যদিও দুর্বল, কিন্তু রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক উটের সন্ধান বলা দেওয়া ও কুরাঈশদের সামনে ইসরা-মিরাজের সত্যতা প্রমাণ হয়ে যাবার ব্যাপারে অন্যত্র সহীহ বিবরণ রয়েছে। সে সহীহ বিবরণে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক উম্মে হানী(রা.) এর গৃহে অবস্থানের কোনো উল্লেখ নেই; শুধুমাত্র কুরাঈশদের সাথে তাঁর কথোপকথনের উল্লেখ আছে যাতে তিনি তাদেরকে উটের সে ঘটনাটি বলেছেন। এবং কুরাঈশরা তাঁর কথার সত্যতার প্রমাণ পেয়েছে। ইমাম বায়হাকী(র.)ও আবু ইসমাঈল তিরমিযী(র.) হতে দুটি সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেনঃ এর সনদ সহীহ।

দেখুনঃ  তাফসির ইবন কাসির, ৬ষ্ঠ খণ্ড (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), সুরা বনী ইস্রাঈলের ১ নং আয়াতের তাফসির, পৃষ্ঠা ২২৮