কা'বা ও আল আকসা নির্মাণের সময়ের ব্যাবধান সম্পর্কে হাদিসের তথ্য কতটুকু সঠিক?

কুরআন/হাদিসের (তথাকথিত) অসঙ্গতি সংক্রান্ত



 

নাস্তিক প্রশ্নঃ হাদিস বলে- মসজিদুল হারাম আর আল আকসা(বাইতুল মুকাদ্দাস) এর মাঝে ব্যবধান ৪০ বছর।

কুরআন বলে- মসজিদুল হারাম(কাবা) এর নির্মাতা নবী ইব্রাহিম(Abraham- 1812-1637 BC)।

অথচ  Temple Mount(বাইতুল মুকাদ্দাস) (958-951 BC) প্রতিষ্ঠা করেন নবী সুলাইমান(King Solomon - 970-930 BC)। ইব্রাহিম ও সুলাইমানের মাঝে প্রায় হাজার বছরের ব্যবধান।এটা কি কুরআন ও হাদিসের তথ্যের অসঙ্গতি নয়?

 

উত্তরঃ আল কুরআনে বলা হয়েছেঃ

 

“নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা বাক্কায়(মক্কা) অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্য হেদায়েত ও বরকতময়।”

(কুরআন, আলি ইমরান ৩:৯৬)

 

“আর স্মরণ কর, যখন ইব্রাহিম ও ইসমাঈল কাবার ভিতগুলো উঠাচ্ছিল (এবং বলছিল,) ‘‘হে আমাদের প্রভু, আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।”

(কুরআন, বাকারাহ ২:১২৭)

 

আবূ যার গিফারী(রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! সর্বপ্রথম কোন মাসজিদ নির্মিত হয়েছে? তিনি বলেন: মাসজিদুল হারাম। আমি আবার বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বলেন: তারপর মসজিদুল আকসা। আমি বললাম, উভয়ের মধ্যে ব্যবধান কত বছরের? তিনি বলেন: চল্লিশ বছরের।  যেখানেই তোমার সলাতের ওয়াক্ত হয়, সেখানেই তুমি সলাত আদায় করতে পারো কেননা এখন তোমার জন্য সমগ্র পৃথিবীই মাসজিদে। ।

[সহীহ বুখারী, খণ্ড ৪, অধ্যায় ৫৫(নবী ও রাসুলগণ অধ্যায়), হাদিস ৬৩৬;

সহীহ মুসলিম ৫২০, সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদিস ৭৫৩]

 

কুরআনের বিবরণ দ্বারা এটা স্পষ্ট যে কাবা নির্মাণ করেছেন ইব্রাহিম(আ) ও ইসমাঈল(আ)। সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে কাবা নির্মাণের ৪০ বছর পর আল আকসা(বাইতুল মুকাদ্দাস) মসজিদের উৎপত্তি। নাস্তিক-মুক্তমনা ও খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারকদের দাবি হচ্ছেঃ Temple Mount(আল আকসা) নির্মাণ করেন সুলাইমান(আ)।অথচ তাঁর ও ইব্রাহিম(আ) এর মাঝে প্রায় হাজার বছরের ব্যবধাণ। কাজেই হাদিসে উল্লেখিত “কাবা ও আল আকসার মধ্যে ব্যবধাণ ৪০ বছরের” এই তথ্য সত্য হতে পারে না(নাউযুবিল্লাহ)।

 

হাদিসটির ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনিল কাইয়িম(র) বলেনঃ

“এ হাদিসটি তাদের জন্য বোঝা কষ্টকর যারা এতে কী উদ্যেশ্য করা হয়েছে তা জানে না।কেউ হয়তো বলতে পারেঃ- “এ তো সবাই জানে যে নবী সুলাইমান বিন দাউদ(আ) মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন এবনং তাঁর ও ইব্রাহিম(আ) এর মধ্যে হাজার বছরের ব্যবধান।”

এর দ্বারা এমন ব্যক্তির অজ্ঞতা বোঝা যায়। কেননা সুলাইমান(আ) তো শুধুমাত্র আল আকসা পুনঃনির্মাণ ও নতুন রূপ দান করেছেন। তিনি মোটেও সর্বপ্রথম এটি প্রতিষ্ঠা করেননি বা নির্মাণ করেননি।বরং যিনি প্রকৃতপক্ষে এটি (সর্বপ্রথম) নির্মাণ করেন তিনি হচ্ছেন ইয়া’কুব বিন ইসহাক(আ)। এবং এটি ছিল মক্কায় ইব্রাহিম(আ) এর কাবা নির্মাণের পরবর্তী কালে।“

[যাদুল মা’আদ ১/৫০]

 

অর্থাৎ নবী ইয়া’কুব(আ) হচ্ছেন আল আকসা (বাইতুল মুকাদ্দাস) মসজিদের সর্বপ্রথম গোড়াপত্তনকারী। তিনি ছিলেন নবী ইব্রাহিম(আ) এর নাতি। দাদা ও নাতির কাজের মাঝে ৪০ বছরের ব্যবধান থাকা খুবই সম্ভব। কাজেই হাদিসে কাবা ও আল আকসার মাঝে ৪০ বছরের ব্যবধানের তথ্যের  সঙ্গে এই তথ্য পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।

 

চলুন দেখি ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ এ ব্যাপারে কী বলে----

 

  " এদিকে যাকোব{ইয়া'কুব(আ)} বের-শেবা ছেড়ে হারণ শহরের দিকে যাত্রা করলেন। পথে এক জায়গায় বেলা ডুবে গেলে তিনি সেখানেই রাতটা কাটালেন। সেখানে কতগুলো পাথর পড়ে ছিল। যাকোব সেগুলোর একটা মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে পড়লেন।

তিনি স্বপ্নে দেখলেন মাটির উপরে একটা সিঁড়ি দাঁড়িয়ে আছে এবং তার মাথাটা গিয়ে স্বর্গে ঠেকেছে। তিনি দেখলেন ঈশ্বরের স্বর্গদূতেরা(ফেরেশতা) তার উপর দিয়ে ওঠা-নামা করছেন, আর সদাপ্রভু ঈশ্বর তার উপরে দাঁড়িয়ে বলছেন, “আমি সদাপ্রভু। আমি তোমার পূর্বপুরুষ আব্রাহামের [ইব্রাহিম(আ)] ঈশ্বর এবং ইসহাকেরও ঈশ্বর। তুমি যেখানে শুয়ে আছ সেই দেশ আমি তোমাকে এবং তোমার বংশের লোকদের দেব। তোমার বংশের লোকেরা দুনিয়ার ধূলিকণার মত অসংখ্য হবে। পূর্ব-পশ্চিমে এবং উত্তর-দক্ষিণে তোমার বংশ ছড়িয়ে পড়বে। দুনিয়ার সমস্ত জাতি তোমার ও তোমার বংশের মধ্য দিয়ে আশির্বাদ পাবে।

আমি তোমার সংগে সংগে আছি; তুমি যেখানেই যাও না কেন আমি তোমাকে রক্ষা করব। এই দেশেই আবার আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনব। আমি তোমাকে যা বলেছি তা পূর্ণ না করা পর্যন্ত আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।”

 

পরে যাকোব ঘুম থেকে উঠে বললেন, “তাহলে সদাপ্রভু নিশ্চয়ই এই জায়গায় আছেন অথচ আমি তা বুঝতে পারি নি।”এই কথা ভেবে তাঁর মনে ভয় হল। তিনি বললেন, কি অসাধারণ এই জায়গা! এটা ঈশ্বরের ঘর ছাড়া আর কিছু নয়; স্বর্গের দরজা এখানেই।

যাকোব খুব ভোরে উঠলেন এবং যে পাথরটা তিনি মাথার নীচে দিয়েছিলেন সেটা থামের মত করে দাঁড় করিয়ে তার উপরে তেল ঢেলে দিলেন। তিনি জায়গাটার নাম দিলেন বেথেল (বাইত+এল=বেথেল; যার মানে “আল্লাহর ঘর”)। এই জায়গাটার কাছের শহরটার আগের নাম ছিল লূস।

এরপর যাকোব {ইয়া'কুব(আ)}  এক প্রতিজ্ঞা করে বলল, “যদি ঈশ্বর আমার সহায় থাকেন, যদি তিনি আমাকে এ যাত্রায় রক্ষা করেন, যদি তিনি আমার খাদ্য ও পরনের কাপড় যোগান, আর যদি আমি শান্তিতে আমার পিতার গৃহে ফিরতে পারি, যদি ঈশ্বর এই সমস্ত কিছুই সাধন করেন তাহলে প্রভুই আমার ঈশ্বর হবেন।

এই পাথর আমি স্মৃতিস্তম্ভ রূপে স্থাপন করছি। এটা প্রমাণ করবে যে এ জায়গা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে এবং পবিত্র জায়গা। এবং ঈশ্বর আমাকে যা কিছু দেবেন তার দশ ভাগের এক ভাগ অংশ আমি ঈশ্বরকে দেব।”"

[ইহুদি তানাখ -Bereishit; খ্রিষ্টান বাইবেল -আদিপুস্তক/Genesis ২৮:১০-২২]

 

ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থের আলোচ্য অংশে আমরা সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি যে কিভাবে বনী ইস্রাঈলের পিতা নবী ইয়া’কুব(আ) আল আকসার গোড়াপত্তন করেন। ইয়াকুব(আ) এর ঐ স্থানের পাথরটির(হিব্রুতেঃ Even Ha-Shetiya) উপরেই বনী ইস্রাঈলের নবীগণের বাইতুল মুকাদ্দাস মসজিদ(Temple Mount) ছিল এবং হাজার হাজার বছর ধরে সেটা ইহুদিদের কিবলা।  [১]

 

সুলাইমান(আ) আল আকসার প্রতিষ্ঠাতা—এই কথা বলে যারা হাদিসে উল্লেখিত তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা ইয়া’কুব(আ) কর্তৃক আল আকসার গোড়াপত্তনের এই তথ্যগুলো চেপে গেছেন কিংবা তাদের এই তথ্যগুলো মোটেও জানা নেই।

 

[[আদম(আ) কর্তৃক সর্বপ্রথম কাবা নির্মাণের কিছু বিবরণ আছে, তবে সেসব বিবরণকে মুহাদ্দিসগণ অত্যন্ত দুর্বল কিংবা বাতিল বলে গণ্য করেছেন। বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ “হাদিসের নামে জালিয়াতী”(খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর(র)), পৃষ্ঠা ২৩৪; ডাউনলোড লিঙ্কঃ https://goo.gl/PW8uBo ; কাজেই এ ব্যাখ্যাটি বিবেচনায় আনা হল না।]]

 

অতএব আবারো প্রমাণিত হল যে কুরআন ও হাদিসে উল্লেখিত ঐতিহাসিক তথ্যে কোন অসঙ্গতি নেই।বরং যারা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাদেরই ইতিহাসজ্ঞানে কমতি রয়েছে।

 

তথ্যসূত্রঃ

 [১] ■ https://en.wikipedia.org/wiki/Foundation_Stone#Jewish_significance

http://www.templeinstitute.org/a-call-to-remember.htm

http://www.cogwriter.com/news/religious-news/temple-institute-claims-about-the-foundation-stone-not-supported-by-scripture-and-differ-from-continuing-church-of-god-beliefs/